চরিত্র সংশোধন (৩৮) ধৈর্য সস্বভাবের নিদর্শন
চরিত্র সংশোধনের সাধনা ও কুস্বভাব বর্জনের উপায়- (পর্ব - ৩৮)
সৌভাগ্যের পরশমণি
ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ধৈর্য সস্বভাবের নিদর্শন
ধৈর্য হইতে অধিকাংশ স্থলে সস্বভাবের পরিচয় মিলে৷ ধৈর্য সম্পর্কে কয়েকটি ঘটনা এস্থলে বর্ণনা করা যাইতেছে। কাফিরগণ রাসূলে মাকবূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) উনার উপর ভীষণ অত্যাচার করিয়াছিল এবং উনাকে অসীম দুঃখ-কষ্ট দিয়াছিল, প্রস্তরাঘাতে তাহারা উনার দাঁত পর্যন্ত ভাঙ্গিয়াছিল। তিনি এই সমস্ত অবিচার, অত্যাচার নির্বিকারচিত্তে সহ্য করিয়াছিলেন এবং আল্লাহর নিকট তাহাদের মঙ্গলের জন্য নিবেদন করিয়া বলিয়াছিলেন— ‘হে আল্লাহ্, তাহাদের প্রতি দয়া করুন, কারণ তাহারা অজ্ঞান, কিছুই বুঝে না”।
একদা হযরত ইবরাহীম আদহাম (রহঃ) এক নির্জন পথ দিয়া গমন করিতেছিলেন I এমন সময় এক সৈনিকের সহিত তাঁহার সাক্ষাত ঘটিল। সৈনিক তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল– “তুমি কি গোলাম”? তিনি বলিলেন- “হাঁ, আমি গোলাম”। সিপাহী আবার জিজ্ঞাসা করিল— “মানব বসতি কোন দিকে বলিতে পার”? হযরত ইবরাহীম আদহাম (রহঃ) বলিলেন- “কবরস্থান”? সিপাহী বলিল- “আমি লোকালয় তালাশ করিতেছি”। তিনি বলিলেন- “কবরস্থানই লোকের স্থায়ী বাসস্থান”। ইহাতে সৈনিক রাগান্বিত হইয়া হযরত ইবরাহীম আদহামের মস্তকে এতজোরে বেত্রাঘাত করিল যে, মস্তক বিদীর্ণ হইয়া রক্ত প্রবাহিত হইতে লাগিল এবং তাঁহাকে গ্রেফতার করিয়া নগরের দিকে চলিল। লোকে ইহা দেখিয়া সিপাহীকে ভৎসনাপূর্বক বলিল- “বেটা নির্বোধ, কত বড় অন্যায় করিলে। ইনিই শ্রেষ্ঠ দরবেশ হযরত ইবরাহীম আদহাম (রহঃ)"। সৈনিক তৎক্ষণাত অশ্বপৃষ্ঠ হইতে অবতরণপূর্বক হযরতের পদচুম্বন করিল এবং নিবেদন করিল- “আপনি স্বীয় পরিচয় না দিয়া কেন বলিলেন যে, আপনি গোলাম”? হযরত বলিলেন- “আমি স্বাধীন নই, বাস্তবিকই আমি আল্লাহর গোলাম”। সিপাহী সবিনয়ে আরয করিল- “না বুঝিয়া অন্যায় করিয়াছি; আমাকে মাফ করুন”। হযরত ইবরাহীম আদহাম (রহঃ) সহাস্য বদনে বলিলেন- “তখনই তোমাকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছি। যে সময় তুমি আমার মস্তক বিদীর্ণ করিয়া দিলে তখনই তোমার মঙ্গল কামনা করিয়া আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিয়াছি”। অভিশাপ না দিয়া দোআ করার কারণ লোকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন- “আমি অবগত ছিলাম যে, তোমার বেত্রাঘাতের দরুন আমি প্রচুর পুণ্য লাভ করিব। সুতরাং যাহার কারণে আমি পুণ্য লাভ করিব, সেই ব্যক্তি আমার কারণে পাপী হইবে, ইহা আমি সমীচীন মনে করি নাই”।
হযরত আবূ উছমান হাইরীকে (রহঃ) এক ব্যক্তি নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। আহারে তাঁহাকে পরিতৃপ্ত করা অপেক্ষা তাঁহার স্বভাব পরীক্ষা করাই সেই ব্যক্তির উদ্দেশ্য ছিল। হযরত তাহার দ্বারে উপস্থিত হইলে সে তাঁহাকে গৃহে প্রবেশ করিতে দিল না এবং বলিল- “সব শেষ হইয়া গিয়াছে, এখন কিছুই খাইবার নাই, ফিরিয়া যাও”। ইহা শুনিয়া তিনি পূর্বের ন্যায় সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরিয়া চলিলেন। কিয়দ্দূর চলিয়া গেলে সেই ব্যক্তি আবার তাঁহাকে আহ্বান করিল। তিনি কোন আপত্তি না করিয়া আবার তাহার গৃহদ্বারে উপস্থিত হইলে এবারও সে তাঁহাকে গৃহে প্রবেশ করিতে দিল না এবং পূর্বের ন্যায় বলিল যে, কিছুই খাইবার নাই। সেই ব্যক্তি কয়েকবারই এইরূপ করিল। তাঁহাকে আহবান করিলেই তিনি দ্বিরুক্তি না করিয়া অম্লান বদনে আগমন করিতেন এবং গৃহে প্রবেশ করিতে না দিয়া তাড়াইয়া দিলে নির্বিকারে চলিয়া যাইতেন । ইহাতে তিনি অসহিষ্ণু হইতেন না। ইহা দেখিয়া সেই ব্যক্তি অবশেষে নিবেদন করিল- “হে মহাত্মন, আপনাকে পরীক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে আমি এরূপ কাজ করিয়াছি। আমাকে মাফ করুন। বুঝিলাম আপনার স্বভাব অতি উত্তম”। ইহা শুনিয়া হযরত হাইরী (রহঃ) সেই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “এরূপ পরীক্ষা দ্বারা আমার মধ্যে কি গুণ দেখিতে পাইলে? এইভাবে আমাতে যে গুণ দেখিলে তাহাতো কুকুরের মধ্যেও আছে। কুকুরকে আহ্বান করিলেই প্রসন্ন বদনে হাযির হইবে, আবার কিছু না দিয়া তাড়াইয়া দাও, নির্বিকার চিত্তে চলিয়া যাইবে। ইহাতে কি মাহাত্ম্য আছে?”
একদা জনৈক ব্যক্তি ছাদের উপর হইতে এক বড় রেকাবিপূর্ণ ছাই হযরত আবূ উছমান হাইরীর (রহঃ) মাথার উপর নিক্ষেপ করিল। এই দুর্ব্যবহারে তিনি ধৈর্যচ্যুত না হইয়া অম্লান বদনে তাঁহার পরিধানের পরিচ্ছদ ঝাড়িয়া লইলেন এবং আল্লাহ্কে ধন্যবাদ দিলেন। লোকে জিজ্ঞাসা করিল- “আপনার উপর ছাই নিক্ষেপ করাতে আপনি আল্লাহ্কে ধন্যবাদ দিলেন কেন?”
তিনি বলিলেন- “যে ব্যক্তি অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার উপযোগী তাহার উপর মাত্র ছাই নিক্ষেপ করা হইয়াছে, এইজন্যই আল্লাহ্কে ধন্যবাদ দিলাম”।
হযরত আলী ইব্ন মূসা রেযার (রহঃ) দেহ ধূসর বর্ণের ছিল। নেশাপুরে তাঁহার গৃহের তোরণ দ্বারে একটি স্নানাগার ছিল। তিনি স্নানাগারে গমন করিলে অন্য কেহই তথায় থাকিত না। একদা তিনি উক্ত স্নানাগারে গমন করিলেন, এবং ইহা তাঁহার জন্য খালি করিয়া দেওয়া হইল। তিনি স্নানাগারে প্রবেশ করিলেন। ইতিমধ্যে উক্ত স্নানাগারের চৌকিদার অন্যমনস্ক হইয়া কোথায় চলিয়া গেল। এই সুযোগে এক গঁওয়ার ব্যক্তি স্নানাগারে প্রবেশ করিল। সে হযরত আলী ইব্ন মূসা রেযাকে (রহঃ) দেখিয়া তাঁহাকে স্নানাগারের একজন ভৃত্য বলিয়া মনে করিল এবং তাঁহাকে আদেশ করিল— “যাও, পানি লইয়া আস”। তিনি তৎক্ষণাত তাহাকে পানি আনিয়া দিলেন। সে গঁওয়ার আবার বলিল- “যাও মাটি লইয়া আইস”। তিনি তৎক্ষণাত তাহাকে মৃত্তিকাও আনিয়া দিলেন। এইরূপে সে গঁওয়ার হযরতকে আদেশের পর আদেশ দিতে লাগিল, আর তিনিও নির্বিকার চিত্তে সকল আদেশ প্রতিপালন করিতে লাগিলেন।
অবশেষে চৌকিদার আসিয়া উপস্থিত হইল। উক্ত গঁওয়ার হযরতের প্রতি যে সকল আদেশ করিতেছিল সে উহা শুনিতে পাইল এবং তাঁহার প্রতি যে দুর্ব্যবহার করিতেছিল তাহাও দেখিল। চৌকিদারের অসাবধানতা ও অনুপস্থিতির দরুনই যে এই অঘটন ঘটিল, ইহা সে ভালরূপেই বুঝিতে পারিল। অতএব সে স্নানাগার হইতে পলায়ন করিল। হযরত স্নানাগার হইতে বহির্গত হইলে তাঁহাকে জানাইল যে, চৌকিদার স্বীয় অমার্জনীয় অপরাধের শাস্তির ভয়ে পলায়ন করিয়াছে। হযরত বলিলেন- “তাহাকে পালাইয়া যাইতে নিষেধ কর এবং বল যে, তাহার কোন দোষ নাই, বরং দোষ ঐ ব্যক্তির হইতে পারে যে কৃষ্ণবর্ণ কদাকার বান্দীর গর্ভে স্বীয় সন্তানের জন্ম দিয়াছে”।
হযরত আবদুল্লাহ (রঃ) একজন কামিল দরবেশ ছিলেন। তিনি দর্জির কাজ করিতেন। এক অগ্নি উপাসক সর্বদা তাঁহার নিকট হইতে জামা-কাপড় ইত্যাদি সেলাই করাইয়া নিত। কিন্তু সেলাইয়ের পারিশ্রমিকরূপে সে সর্বদা তাঁহাকে জাল টাকা দিত এবং তিনি দেখিয়া শুনিয়াই বিনা আপত্তিতে এই জাল টাকা গ্রহণ করিতেন। একদা তিনি দোকানে ছিলেন না। অগ্নি উপাসক এমন সময় সেলাইয়ের পারিশ্রমিক দিতে আগমন করিল। কিন্তু হযরতের শিষ্য জাল টাকা দেখিয়া গ্রহন করিল না। দোকানে আসিয়া ইহা জানিতে পারিলে তিনি শিষ্যকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “তুমি পারিশ্রমিক গ্রহণ করিলে না কেন? বহু বৎসর যাবত এই অগ্নি উপাসক আমাকে জাল টাকা দিয়া আসিতেছে এবং আমি কখনও ইহা তাহার নিকট প্রকাশ করি নাই। বরং এই জাল টাকা দিয়া সে অপর মুসলমানকে ঠকাইবে ভাবিয়া সর্বদা উহা গ্রহণ করিয়াছি”।
হযরত উয়াইস করনী রদিয়াল্লাহু আনহু যখন কোন স্থানে গমন করিতেন তাঁহাকে পাগল মনে করিয়া বালকেরা তৎপ্রতি পাথর নিক্ষেপ করিত। তিনি তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিতেন- “হে প্রিয় বালকগণ, ছোট ছোট পাথর নিক্ষেপ করিও। বড় বড় পাথর নিক্ষেপ করিয়া আমার পা ভাঙ্গিয়া ফেলিলে নামাযের জন্য দণ্ডায়মান হইতে পারিব না”।
হযরত আহ্আফ ইব্ন কাইস (রহঃ) একদা রাস্তা দিয়া গমনকালে এক ব্যক্তি তাঁহাকে গালি দিতে দিতে তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে চলিল। তিনি নীরবে সব সহ্য করিয়া যাইতেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের আপন লোকদের গৃহের নিকটবর্তী হইয়া দন্ডায়মান হইলেন এবং সেই ব্যক্তিকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন- “হে বন্ধু, গালিগালাজ আরও অবশিষ্ট থাকিলে উহাও এখনই আমাকে দিয়া দাও, অন্যথায় আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা যদি শুনে যে, তুমি আমাকে গালিগালাজ করিতেছ, তবে তাহারা তোমাকে যাতনা দিবে”।
একদা একজন স্ত্রীলোক হযরত মালিক ইব্ন দীনারকে (রহঃ) রিয়াকার (অর্থাৎ সুখ্যাতিপ্রিয় ও লোক দেখানো সৎকর্মশীল) বলিয়া আহ্বান করিল। ইহা শুনিয়া তিনি বলিলেন- “হে পুণ্যশীলা রমণী, বসরাবাসিগণ আমার প্রকৃত নাম ভুলিয়া গিয়াছিল। তুমি উত্তম করিয়াছ যে ইহা স্মরণ করাইয়া দিলে”।
**সমাপ্ত**
প্রথম পর্ব

Comments
Post a Comment