তওবার মকাম (পর্ব- ৩) তওবার প্রারম্ভিকা

 


 তওবার মকাম  (পর্ব-  ৩)
📚মিনহাজুল আবেদীন -- ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) 

 তওবার প্রারম্ভিকা
তওবার প্রারম্ভিক হিসেবে তিনটি কাজ করতে হয়। প্রথমত, পাপের সর্বাপেক্ষা মন্দ দিকটি নিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্ তা'আলার আযাবের ভয়াবহতা বিরক্তি ও অসন্তুষ্টির এমন পর্যায়টিকে স্মরণ করবে যা সহ্য করার ক্ষমতা ও সামর্থ্য কোন মানুষেরই নেই। তৃতীয়ত, নিজের দুর্বলতা ও স্বল্পস্থায়ী জীবনের কথা স্মরণ করবে। মনে করবে, যে মানুষ সূর্যের উত্তাপ, শীতের প্রকোপ এবং পিপীলিকার দংশন পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না, সে কি করে কঠিন যন্ত্রণাদায়ক দোযখের আযাব এবং ফেরেশতাদের নির্মম প্রহার সহ্য করতে সক্ষম হবে? অথচ সেই দোযখের মধ্যে যে সর্প দংশন করবে, তার এক-একটার আকার হবে উটের ন্যায়, যে বিচ্ছু দংশন করবে, তার এক-একটার আকৃতি হবে গাধার ন্যায়। দোযখের অগ্নির সর্বাপেক্ষা তীব্র দহন অবস্থা থেকে এ সকল জীব সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন তুমি এ সকল বিষয়ে চিন্তার দিকে অগ্রসর হয়ে থাকবে এবং রাতদিন সর্বক্ষণ এগুলো স্মরণ রাখতে সক্ষম হবে, তখন তুমি খাঁটি তওবা লাভ করতে পারবে।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন যে, “লজ্জা ও অনুতাপ তওবার পদক্ষেপ”। অথচ তওবা সম্পর্কে  উপরোল্লিখিত শর্তাদির মধ্যে তো তা অন্তর্ভুক্ত করা হলো না।

এ ব্যাপারে প্রথমত একটি বিষয় খুবই উত্তমভাবে লিপিবদ্ধ করা দরকার যে, অনুশোচনা বান্দার করায়ত্তেই নয়। অবশ্য অনেক সময় কতিপয় মানসিক কারণে অনুতাপ-অনুশোচনা এসে যেতেও পারে এবং সে হয়তো উক্ত পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য চেষ্টাও করতে পারে।

কিন্তু তওবার ব্যাপারটিই আলাদা। এটা মানুষেরই সামর্থ্যের অধীন। সে ইচ্ছা করলে এ কাজটা সমাধা করতে পারে। তাছাড়া একথা তো সবারই জানা যে, গুনাহর পর যদি অনুতাপ-অনুশোচনা আসেও তাতে মানুষের নিকট তার মর্যাদার বিলুপ্তি হয় না। কিংবা তার কোন আর্থিক লোকসানও হয় না। সুতরাং এটা কিছুতেই তওবা নামে অভিহিত হতে পারে না। তাছাড়া, একথাও পরিষ্কার বোঝা যায় যে, উক্ত হাদীসের অর্থ অন্যরূপ, শব্দানুযায়ী বাহ্যত যা উপলব্ধি করা সম্ভব নয় তা এই যে, আল্লাহ্ তা'আলার অসীম ক্ষমতা ও তাঁর আযাবের ভয়েই অনুশোচনা হওয়া উচিত (তওবায়ে নসূহ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে)। কারণ এটি তওবাকারীদের গুণ ও হালতেরই অন্তর্ভুক্ত। তওবার প্রারম্ভিকায় যে তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, তা যখন স্মরণ করবে তখন সে অবশ্যই অনুতপ্ত হয়ে পড়বে। এই অনুতাপ গুনাহতে লিপ্ত হওয়া থেকে তাকে বিরত থাকতে বাধ্য করবে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতের জন্য এ অনুশোচনার প্রভাব তার অন্তরে বিদ্যমান থাকবে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, তওবার গুণাবলীর ও তওবাকারীর গুণাবলীর মধ্যে এসব বিষয় এসেই পড়ে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এ জন্যই তাকে তওবা বলে অভিহিত করেছেন।

মোটকথা, এসব বিষয় আল্লাহ্ প্রদত্ত তৌফিক অনুযায়ী খুব ভালভাবে উপলব্ধি করা দরকার ।

এরপর আরও একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আম্বিয়ায়ে কিরাম (সালাওয়াতুল্লাহি ওয়া সালামাহু আলায়হিম) যাঁদের থেকে কখনো ছোট বা বড় কোন রকমের গুনাহ্ই সাধিত হয়নি, তাঁরাও এমন উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছিলেন কিনা এ প্রশ্নে উলামায়ে কিরাম একমত নন। তাহলে সাধারণ একজন মানুষ কি করে তা হাসিল করতে পারবে? অথচ নবীগণই তো আল্লাহর মখলুকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন।

এর জবাব এই যে, এ জিনিসটি মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে অসম্ভব নয়, বরং সহজ। তবে রাব্বুল ইয্যত তাঁর অনুগ্রহ অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা বিশেষভাবে তাকে এ মর্যাদা দান করেন।

তওবার আরও একটি শর্ত এই যে, ইচ্ছাকৃতভাবে কোন পাপেই আর লিপ্ত হতে পারবে না। তবে যদি ভুলক্রমে কিছু হয়ে যায় আল্লাহ্ তা'আলা তা তাঁর অনুগ্রহ ও করুণার দ্বারা মাফ করে দেবেন। মনে রাখবে, এ শর্তটি পালন করাও কঠিন কিছু নয়, যদি আল্লাহ্ তৌফিক দান করেন।

পুনরায় পাপে লিপ্ত হতে পারবে না, এ কারণে যদি কেউ মনে করে যে, আমার দ্বারা তওবাই সম্ভব নয়। কারণ নিজের নফসের খবর আমার জানা আছে, তওবার উপর দৃঢ় থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না, আমি হয়তো পুনরায় পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ব। সুতরাং তওবা করে আমার কি লাভ? তাহলে মনে রাখবে, এটা হচ্ছে শয়তানের ধোঁকা ।

Comments

Popular posts from this blog

চরিত্র সংশোধন (১৩) আন্তরিক ব্যাধির ঔষধ ও প্রয়োগ বিধি

চরিত্র সংশোধন (১০) কুম্বভাবের প্রতিষেধক

চরিত্র সংশোধন (৮) ক্রোধ ও লোভকে আজ্ঞাবহ রাখার প্রতিবন্ধক