তওবার মকাম (পর্ব- ৪) পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায়
পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায়
প্রথমত, আল্লাহর ওয়াজিবসমূহ ত্যাগ করা— যথা নামায, রোযা, যাকাত, কাফ্ফারা। যতদূর সম্ভব এ সকল আদায় করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্ ও বান্দার মধ্যে যা সংঘটিত হয়-- যথা মদ্যপান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, সূদ খাওয়া ইত্যাদি। এসব কাজে লিপ্ত হলে পরক্ষণেই অনুতপ্ত হওয়া উচিত এবং পুনরায় যাতে তাতে লিপ্ত না হতে হয়, তজ্জন্য মনকে দৃঢ় করা দরকার।
তৃতীয়ত, মানুষের পরস্পরের উপর পরস্পরের যে হক আছে, সে ব্যাপারে পাপে লিপ্ত হওয়া। এ পর্যায়টি বড় কঠিন ও মারাত্মক।
শেষোক্ত পর্যায়ের পাপ আবার কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। কখনো এ পর্যায়ের পাপ আর্থিক ব্যাপারে সংঘটিত হয়। আবার কখনো জীবন, মান-ইযযত ও ধর্মের ব্যাপারে সংঘটিত হয়। যদি বিষয়-সম্পদ সম্পর্কিত কোন কাজ হয়, তবে সে মাল ফিরিয়ে দেয়া ওয়াজিব। যদি কেউ দারিদ্র্য ও সহায়-সম্বলহীনতার জন্য মাল ফিরিয়ে দিতে না পারে তবে এ জিনিস তারই থাকবে। যদি মালের মালিক অনুপস্থিত বা ইন্তেকাল করে থাকে, তবে সদকা করতে পারলে সদকা দিতে হবে। সদকা-খয়রাত করার সামর্থ্যও যদি না থাকে, তবে অধিক নেকী করে আল্লাহর সামনে সেজন্য অনুশোচনা করবে, যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয়।
আর যদি কোন মানুষের নিজের হক সংশ্লিষ্ট কোন ব্যাপারে তোমার দ্বারা অন্যায় সাধিত হয় তবে তাকে অথবা তার প্রতিনিধিদের কাউকে প্রতিশোধ নেয়ার অনুমতি দেবে, যাতে অন্যায়ের বদলা নিতে পারে অথবা মাফ করে দেয়ার সুযোগ পায়। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে আল্লাহর দরবারে আহাজারী করবে, কিয়ামতের দিন যাতে আল্লাহ্ পাক সে ব্যক্তিকে তোমার প্রতি সন্তুষ্ট করিয়ে দেন। ইয্যত ও মর্যাদা সম্পর্কিত কোন কিছু যদি হয়ে যায়-- যেমন তুমি কারো গীবত করলে কিংবা কারো উপর অপবাদ দিলে অথবা কাউকে গালিগালাজ করলে-- এ ক্ষেত্রে তুমি যার সামনে এ কাজ করেছ, তার সামনেই আবার তোমাকে তার অসত্যতা প্রমাণিত করে নিজেকে মিথ্যাবাদী বলে জানাতে হবে এবং যদি সামর্থ্যে কুলায় তবে তোমার সেই সঙ্গী ব্যক্তির নিকট থেকে তাকে মাফ করিয়ে নেবে-- অবশ্য যদি এতে কোন ঝগড়া-ফ্যাসাদ সৃষ্টির আশঙ্কা না থাকে। যদি ঝগড়া-ফ্যাসাদের ভয় থাকে, তবে আল্লাহ্ পাকের দরবারে সব কিছু জানিয়ে রাখবে এবং নিজের সঙ্গীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে, যাতে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে তোমার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন এবং তার বদলে দান করেন অসংখ্য পুণ্য।
এর পরে আসে সম্মানহানি বা সতীত্বহানির প্রশ্ন। যে ব্যক্তির পরিবার পরিজনের সাথে এ ব্যাপারে কোন খেয়ানত হয়ে যায়, তার নিকট বিষয়টি অবশ্য প্রকাশ করা বা তার থেকে মাফ নেয়ার উপায় থাকে না। কারণ এতে ফিতনা-ফাসাদ দেখা দেয়ার আশঙ্কা বেশি। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নিকট সব বিষয় প্রকাশ করে তার জন্য দোয়া করা দরকার, যাতে আল্লাহ্ পাক তাকে তোমার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন এবং বদলে তাকে দান করেন পুণ্য । আর যদি ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তবে তার নিকট থেকে মাফ নেয়া দরকার। তবে শেষোক্ত পরিবেশ খুব কমই পরিলক্ষিত হয়।
ধর্ম সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে যদি কোন পদস্খলন হয়, যেমন তুমি যদি কাউকে বিদ'আতী, গোমরাহ প্রভৃতি বলে অভিহিত কর, তবে এ পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভ খুবই কঠিন। এক্ষেত্রে তুমি যার সামনে এ ধরনের মন্তব্য করেছ, তারই সামনে নিজেকে মিথ্যা বলে প্রমাণিত করবে। যদি সামর্থ্য থাকে, তোমার সঙ্গীর থেকে মাফ করিয়ে নেবে নতুবা আল্লাহ্ পাকের সামনে অনুতপ্ত মনে আহাজারী করবে, যাতে তিনি তোমার প্রতি সে ব্যক্তিকে রাযী কবিয়ে দেন।
সারকথা এই যে, এ সকল ক্ষেত্রে যার হক নষ্ট হবে, তাকে যদি সন্তুষ্ট করার সুযোগ ও সামর্থ্য থাকে, তবে তা-ই করতে হবে। নতুবা আল্লাহ্ পাকের নিকট বিনয়, নম্রভাব ও অনুশোচনা এবং দান-খয়রাতের সাথে বিষয়টি পেশ করবে, যেন আল্লাহ্ পাক সে ব্যক্তিকে তোমার প্রতি রাযী করিয়ে দেন। আল্লাহর ইচ্ছায়ই এসব বিষয় কিয়ামতের দিন সংঘটিত হবে।
সাথে সাথেই আল্লাহ্ তা'আলার অশেষ অনুগ্রহ ও সীমাহীন করুণা সম্পর্কে গভীর আশাবাদী থাকতে হবে। কারণ আল্লাহ্ পাক যখন বান্দার সততার পরিচয় পাবেন, তখন তিনি যার হক নষ্ট করা হয়েছে, স্বীয় করুণাধারায় সিক্ত করে তাকে রাযী করিয়ে দেবেন। এতে তারও উত্তম হক আদায় হয়ে যাবে। এসব বিষয়কে অপরিহার্য মনে করা উচিত।
মোটকথা, উপরিউক্ত বর্ণনা অনুযায়ী যদি কেউ আমল করে এবং ভবিষ্যতে সে পাপে পুনরায় লিপ্ত হওয়া থেকে মনকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়, তবে সকল গুনাহ্ থেকেই পরিত্রাণ পাবে। কিন্তু যদি কেবল মনকে আয়ত্তে আনা হলো, আর উপরিউক্ত বিষয়গুলো পালন করা হলো না, যার হক নষ্ট হয়েছে তাকেও রাযী করা হলো না, তাহলে সেই পাপের শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে । তবে হ্যাঁ, সকল গুনাহ্ থেকেই পরিত্রাণ লাভ সম্ভব কিন্তু এখানে এ ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ কিতাবের আয়তন বেড়ে যাবে।
যদি কারো এ সকল বিষয় জানার গভীর আগ্রহ থাকে, তবে তিনি 'কিতাবুত্তাওবা' 'কিতাবুল কুরবাতু ইলাল্লাহি তা'আলা' 'আলগায়াতুল কাসওয়া ‘ইয়াহয়াউল উলূমুদ্দীন' প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ করতে পারেন। এগুলো পাঠ করলে অত্যন্ত উপকার সাধিত হবে এবং বহু অভাবিতপূর্ব ও রহস্যপূর্ণ বিষয় জানতে পারবেন। কিন্তু এখানে যতটুকু বর্ণিত হলো, তা অবশ্যই আমল করতে হবে। কারণ এছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।

Comments
Post a Comment