চরিত্র সংশোধন (২) সৎস্বভাবের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতিদান
চরিত্র সংশোধনের সাধনা ও কুস্বভাব বর্জনের উপায়- (পর্ব - ২)
সৎস্বভাবের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতিদান
আল্লাহ্ তাআলা নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে উৎকৃষ্ট স্বভাবী বলিয়া প্রশংসা করত ইরশাদ করেন, "হে মুহম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আপনি অত্যন্ত উন্নত ও সৎসভাবের অধিকারী"
হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,- "সৎস্বভাবের সর্বোচ্চ আদর্শ পূর্ণ করার নিমিত্ত আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন।"
অন্যত্র তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেন, "শুধু সৎস্বভাব-কে দাড়ির এক পাল্লায় স্থাপন করিয়া অন্যান্য সমুদয় বস্তু অপর পাল্লায় স্থাপন করিলে সৎস্বভাবই অধিক ভারী হবে"।
এক ব্যক্তি রাসুলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার নিকট উপস্থিত হইয়া আরয করিল -ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ধর্ম কি বস্তু ? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেন "সৎস্বভাব"। সেই লোকটি ডানে-বামে ঘুরিয়া ফিরিয়া বারবার একই প্রশ্ন করিতেছিল আর তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেকবারই একই উত্তর দিয়েছিলেন। অবশেষে রসুলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তাহাকে লক্ষ্য করিয়া ইরশাদ করেন, - "তুমি কি অবগত নও যে, ক্রোধের বশীভূত না হওয়াকেই ধর্ম বলে"।
লোকেরা রাসুলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞসা করিল "কোন বস্তু সর্বোত্তম"? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ফরমাইলেন "সৎস্বভাব"।
এক ব্যক্তি রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার নিকট নিবেদন করিলেন, - "ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম), আমাকে কিছু উপদেশ প্রদান করুন"। তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ফরমান,- "তুমি যেই স্থানেই থাকনা কেন, আল্লাহ তা'আলা-কে ভয় করিবে"। সেই ব্যক্তি নিবেদন করিল - আরো উপদেশ দিন। তিনি ফরমাইলেন- "তোমার দ্বারায় অকষ্মাৎ কোন খারাপ কার্য হইয়া পরিলে, কোন না কোন সৎকর্ম করিবে, তাহা হলে সেই সৎকর্ম উক্ত অসৎকর্ম চুকাইয়া ফেলিবে"। সেই ব্যক্তি আবার নিবেদন করিল- "আরো কিছু উপদেশ প্রদান করুন"। তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উপদেশ দিলেনন,- "প্রফুল্লাত ও সৎস্বভাবের সহিত লোকদের সহিত মিলিবে"।
অন্যত্র রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ তাআলা যাহাকে সৎস্বভাব ও সুন্দর চেহারা দান করিয়াছেন তাহাকে তিনি (আল্লাহ্) দোযখে নিক্ষেপ করিবেননা"।
কতিপয় লোক একদা রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল,- "ইয়া রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম), অমুক স্ত্রীলোক সদা রোজা রাখে এবং সারারাত্রি নামাজ পড়ে, কিন্তু তাহার স্বভাব বড় খারাপ।; অশ্লীল ও কর্কশ বাক্যে প্রতিবেশীদিগকে অহরহ কষ্ট দিয়ে থাকে"। ইহা শ্রবন করিয়া তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-"তাহার স্থান দোযকে!"
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) অন্যত্র ইরশাদ করেন - "সির্কা যেমন মধুকে বিনষ্ট করে, কুস্বভাবও সেইরূপ মানুষের ইবাদতকে বিনষ্ট করিয়া দেয়।"
অনেক সময় রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এইরূপ প্রার্থনা করতেন,-
"হে আল্লাহ আমার শরীর আকৃতি যে রকম সুন্দর করিয়াছ, আমার প্রকৃতিও সেইরকম সুন্দর করুন।" তিনি আরো দোয়া করতেন, -
"হে আল্লাহ্, আপনার নিকট আমি স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সৎস্বভাব প্রার্থনা করছি।"
একদিন কতিপয় লোক রসুলে মকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন,- "আল্লাহ্ তাআলা মানুষকে যাহা দান করিয়াছেন, তন্মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট কি?" তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ফরমাইলেন - "সৎস্বভাব"।
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ মুবারক করেন,-
"বরফ যেমন সূর্যের উত্তাপে গলিয়ে যায়, সৎস্বভাব তেমনি গুনাহ সমূহ নষ্ট করিয়া দেয়"।
হযরত আব্দুর রহমান সামরাহ্ (রঃ) বলেন,- রসুলে করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার নিকট আমি উপস্থিত ছিলাম, তিনি ফরমাইলেন, -
"গতকল্য আমি একটি বিষ্ময়কর ঘঠনা দর্শন করিয়াছি যে, আমার উম্মতের মধ্যে এক ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে হাটু গাড়িয়া বসিয়া রহিয়াছে; কিন্তু তাহার সামনে পর্দা ছিল, যার কারণে সে আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করিতে পারিতেছিলনা। সে সময় তাহার সৎস্বভাব আগমন করিয়া পর্দাটি দূর করত তাহাকে আল্লাহর পৌছাইয়া দিল"।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,
"সৎস্বভাবের ফলে মানুষ 'ছায়িমুদ্দাহর' ও 'কিয়ামুল্লাইলের' মর্যাদা লাভ করিতে পারে।"
অর্থাত সারা বৎসর রোজা রাখিলে ও সমস্ত রজনী জাগ্র থাকিয়া নামাজ আদায় করিলে যে মর্যাদা লাভ করা যায়, কেবল সৎস্বভাবের ফলে সেই মর্যাদা লাভ করা যায়। ইবাদত কম করিলেও সেই ব্যক্তি পরকালে বড় বড় আসন লাভ করিবে।
রাসূলে মকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার স্বভাব অত্যন্ত শ্রেষ্ট ও মহৎ ছিল। একদা কতিপয় স্ত্রীলোক তাহার সন্মুখে গোলমাল করিতেছিল। এমন সময় হযরত ওমর (রঃ) তথায় উপস্থিত হইলে তাহারা সরিয়া গেল। ইহা দেখিয়া হজরত ওমর (রঃ) তাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন,- "হে শত্রুগণ, তোমরা আমকে ভয় কর, কিন্তু রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনাকে ভয় করনা"? - তাহারা বলিল আপনি রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) অপেক্ষা অনেক তীব্র ও কঠিন।" তখন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন, "হে ইবনে খাত্তাব (ওমর), যা আল্লাহর হস্থে আমার জীবন তাহার শপথ, শয়তান তোমাকে দর্শন করামাত্র ভয় পয়। এবং যে পথে তুমি আগমন কর, সেই পথ পরিবর্তন করে অন্য পথে পলায়ন করে।
হযরত ফুযাইল ইবনে আইয়ায (রঃ) বলেন, - "কুস্বভাবী আলেমের সংসর্গ অপেক্ষা সৎস্বভাবী কুকর্মীর সংসর্গ আমার নিকট অধিকতর পছন্দনীয়"। এক কুস্বভাবী ব্যক্তির সহিত পথে ইবনে মুবারক (রহঃ)-এর সাক্ষাত ঘঠিল। কিছুক্ষন উভয়ে একত্রে পথ চলার পর পৃথক হইয়া সেই ব্যক্তি অন্যদিকে যাইতে লাগিল। ইহাতে ইবনে মুনবারক (রহ) ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। লোকেরা তাহাকে রোদনের কারণ জিজ্ঞাস করিতে লাগিল। তিনি উত্তরে বলিলেন,"ওই দুর্ভাগা আমাকে ছারিয়া চলিয়া গেল, কিন্তু তার স্বভাবটি অপরিবর্তীত ভাবে সঙ্গে লইয়া গেল। এতক্ষন আমার সংসর্গে থাকিয়াও স্বীয় চরিত্র সংশোধন করিতে পারিলনা"। তাই আমি রোদন করিতেছি।
হযরত কাত্তানী (রঃ) বলেন, "স্বৎসভাবি ব্যক্তি সুফী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি স্বৎস্বভাবে আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সে আমা অপেক্ষা অধিক সুফী"। হযরত ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায (রহঃ) বলেন, "কুস্বভাব এত বড় গুনাহ্ যে, তাহার বিপক্ষে কোন ইবাদতই সুফল দান করিতে পারেনা। এবং সৎস্বভাব এতই বড় এবাদত যে, কোন গুনাহই তাহার ক্ষতি করিতে পারেনা।
পরবর্তী পর্ব

Comments
Post a Comment