তওবার মকাম (পর্ব- ৫) তওবায়ে নসূহা

  
📚মিনহাজুল আবেদীন -- ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) 
তওবায়ে নসূহা
অতঃপর আর একটি বিষয় খুব ভালভাবে জেনে রাখতে হবে। যে ঘাঁটিটি অত্যন্ত কঠিন, এটা অতিক্রম অত্যন্ত ক্লেশপূর্ণ। এখানে সাফল্য লাভ করতে পারলে যেমন আজিমুশ্শান মরতবা হাসিল হয়, তেমনি ব্যর্থতায় ভীষণ ক্ষতির কারণও হয়।
আমি ওস্তাদ আবূ ইসহাক আল-আসফেরায়নীর (তিনি একজন গভীর ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ও ইবাদতগোযার ব্যক্তি) নিকট থেকে শুনতে পেয়েছি-- তিনি বলেছেন : আমি আল্লাহর নিকট ত্রিশ বছর ধরে মুনাজাত করছিলাম তওবায়ে নসূর তৌফিক দানের জন্য। অতঃপর আমি মনে মনে তাজ্জব হলাম যে, সুবহানাল্লাহ্! ত্রিশ বছর আল্লাহ্ পাকের দরবারে একটি মনোবাঞ্চনা পূরণের জন্য মুনাজাত করলাম, তাও কবুল হলো না। এ সময় আমি দেখতে পেলাম,(স্বপ্নে যেমন মানুষ দেখতে পায়) একজন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “এতেই তুমি তাজ্জব হয়েছ, তুমি কি বিবেচনা করে দেখেছ যে, তুমি আল্লাহ্ তা'আলার নিকট কি জিনিসের প্রত্যাশা করছ? তুমি তো আদতে আল্লাহ্ তা'আলার ভালবাসাই কামনা করছ! কারণ তুমি কি জান না, আল্লাহ্ পাক স্বয়ং ইরশাদ করেছেন আল্লাহ পাক অবশ্যই তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালবাসেন। তুমি কি সেই সব ইমামের প্রতি লক্ষ্য কর নাই, যারা মনের পরিচ্ছন্নতা রক্ষার জন্য কত যত্নবান এবং আখিরাতের প্রস্তুতির ব্যাপারে কত ব্যস্ত?"
তওবার ব্যাপারে বিলম্ব করায় যে ভীষণ ক্ষতি সাধিত হয়, তা বর্ণনাতীত। গুনাহর শুরুই হয় ধ্বংস ও কাঠিন্যের মাধ্যমে, আর পরিণামে ডেকে আনে সীমাহীন বঞ্চনা আর দুর্ভাগ্য। ইবলিসের ব্যাপারটিকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। কেননা এতদুভয়েরই কাজের শুরু ছিল কেবল দুনিয়ায়, আর পরিণতি লাভ করেছে কুফরীতে । ফলে তারা চিরদিনের জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
সর্বদা সচেতন থাকবে। তোমার এ প্রচেষ্টায় হয়তো বা তোমার মন নিষ্কলুষ হয়ে যাবে, হয়তো বা তোমার কাঁধ থেকে সকল গুনাহ্ ভার নেমে পড়বে। মনে রেখো, গুনাহ্ ফলে তোমার মনে কাঠিন্য সৃষ্টি হতে পারে। এ ব্যাপারেও তুমি সতর্ক থাকবে। সালেহীনদের কেউ কেউ বলেছেন : গুনাহ্ দ্বারাই হৃদয় কালিমালিপ্ত হয়। আর হৃদয় কালিমালিপ্ত হওয়ার নিদর্শন এই যে, এ অবস্থায় পাপে কোন ভয়ের উদ্রেক হবে না। আল্লাহ্ পাকের পথে চলার কোন সুযোগই সে গ্রহণ করতে আগ্রহান্বিত হবে না এবং কোন প্রকার নসীহতই মনের উপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হবে না। কোন গুনাহকে ছোট জ্ঞান করো না। যেন এমন না হয় যে, নিজেকে তুমি তওবাকারী ভাবছ, আসলে পড়ে আছ কবীরা গুনাহর মধ্যে।
আবূ আবদুল্লাহ্ বিন আল-হাসান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমার দ্বারা একটি গুনাহ্ হয়েছিল, সে জন্য আমি চল্লিশ বছর ধরে সব সময় ক্রন্দন করে আসছি। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো : আয় আবূ আবদুল্লাহ। কি গুনাহ্ হয়েছিল।
তিনি জবাব দিলেন : আমার এক ধর্মীয় ভ্রাতা একদা আমার সাথে মোলাকাত করতে আগমন করেন। আমি তাঁর জন্য মৎস্য খরিদ করি। অতঃপর উভয়েই তা আহার করি। আহারের পর আমি আমার এক প্রতিবেশীর দেয়ালের নিকট দাঁড়িয়েছিলাম। অতঃপর সেই দেয়াল থেকে একটু মাটি নিয়ে তাতে আমার হাত পরিষ্কার করেছিলাম। সুবহান আল্লাহ্ !
সুতরাং সকলেই নিজ নিজ নফসের সাথে বোঝা-পড়া ও হিসাব-নিকাশে লিপ্ত হও। তওবার প্রতি এগিয়ে যাও অতি দ্রুত। কারণ কখন মৃত্যু আসবে, কারো তা জানা নেই। দুনিয়া একটি ধোঁকা মাত্র। মনে রাখবে, নফস ও শয়তান – উভয়েই মনের পরম শত্রু। আর আল্লাহ্ সকাশে সর্বদাই কাকুতি- মিনতি কর।
আদি পিতা হযরত আদম আলায়হিস্ সালামের ঘটনাকে স্মরণ করো। আল্লাহ্ পাক তাঁকে নিজ হাতে পয়দা করেন এবং স্বীয় রূহ তাঁর মধ্যে ফুঁকে দেন। অতঃপর তাঁকে জান্নাতে সম্মানের সাথে অবস্থানের সুযোগ দান করেন। কিন্তু একটি মাত্র পদস্খলনের জন্য আল্লাহ্ পাক তাঁর উপর কি রকম শাস্তি নাযিল করেন। বর্ণিত আছে, আল্লাহ্ পাক আদম (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ আয় আদম! কে তোমার প্রতিবেশী? তিনি জবাব দিলেনঃ আমার প্রতিবেশী অতি উত্তম। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করলেন : আদম। আমার প্রতিবেশীর যোগ্যতা হারিয়েছ, তুমি এখান থেকে চলে যাও এবং তোমার মাথা থেকে আমার কারামতের মুকুট খুলে ফেল। কারণ আমার যে না- ফরমানী করে, সে আমার প্রতিবেশী থাকতে পারে না। অধিকন্তু এমনও বর্ণিত আছে যে, আদম (আঃ) তাঁর উক্ত ত্রুটির জন্য দু'শ' বছর পর্যন্ত আল্লাহ্ পাকের দরবারে রোনাজারী করলে তিনি তাঁর তওবা কবূল করেন।
এ দু'শ বছরের রোনজারীতে হযরত আদম (আঃ)-এর একটি মাত্ৰ ত্রুটি মোছন করা হয় ! আল্লাহর নবী ও খাস বান্দাদের একটি ভুল পদক্ষেপের বেলায় যদি এমন হয়ে থাকে, তবে অন্যদের-যাদের গুনাহর শেষ নেই, তাদের কি হবে, তা সহজেই অনুমেয়। তওবাকারীদের জন্যই এটি রোনাজারীর স্থান। সুতরাং গুনাহ্তে লিপ্ত ব্যক্তিদের অবস্থা এখানে কি হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোন এক ব্যক্তি ঠিকই বলেছেন : -- 'তওবাকারী নফসের প্রতি ভয় রাখে অথচ সে ব্যক্তির কি দশা হবে, যে তওবাও করে না' !
যা হোক, তওবা করার পর পুনরায় যদি সে পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে অতি দ্রুত পুনরায় তওবা করবে এবং মনে মনে বলবে, আহা। পুনরায় পাপে লিপ্ত হওয়ার আগেই যদি এ তওবার অবস্থায় মৃত্যু হতো, তবে কতই না ভাল হতো। এভাবে তিনবার কি চারবারও যদি হয়, তবুও তওবা করা উচিত অর্থাৎ যখনই গুনাহ্ হয়, তখনই তওবা পুনরায় গুনাহতে লিপ্ত হওয়ার সাথে সাথেই পুনরায় তওবা করতে থাকবে। মনে রাখবে, গুনাহ্ ও তওবা এ দুটোর মধ্যে তওবায় যেন বিলম্ব না হয়। তওবার ব্যাপারে যেন শৈথিল্য না দেখা দেয়। শয়তান সব সময়ই তওবায় বিলম্ব সৃষ্টির চেষ্টা করে। কারণ তওবা নেক কাজেরই পূর্বাভাস দান করে। আল্লাহর নিম্নোক্ত কালামের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায় :
“যে ব্যক্তি, কোন খারাপ কাজ কিংবা নিজের নফসের কোন ক্ষতি সাধন করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায়, সে আল্লাহকে অত্যন্ত ক্ষমাকারী ও করুণাময় হিসেবেই পাবে”।
সুতরাং আল্লাহ্ পাকের তৌফিকের কথা স্মরণ রেখে এসব বিষয় ও এর বিপরীতধর্মী বিষয় সম্পর্কে সজাগ হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।


 তওবার মকাম  (পর্ব-  ৫)


Comments

Popular posts from this blog

চরিত্র সংশোধন (১৩) আন্তরিক ব্যাধির ঔষধ ও প্রয়োগ বিধি

চরিত্র সংশোধন (১০) কুম্বভাবের প্রতিষেধক

চরিত্র সংশোধন (৮) ক্রোধ ও লোভকে আজ্ঞাবহ রাখার প্রতিবন্ধক