তওবার মকাম (পর্ব- ৭) বিপদাপদের ঘাঁটি
তওবার মকাম (পর্ব- ৭)
📚মিনহাজুল আবেদীন -- ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
বিপদাপদের ঘাঁটি--
এরপরেই আল্লাহর ইবাদতের অভিযাত্রীকে বহুতরো বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু এসব বিপদাপদে দমে গেলে চলবে না। এগুলো অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে করে ইবাদতে ইলাহীতে স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব হয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে, বিপদাপদ চার প্রকার।
(১) দুনিয়া বর্জন
দুনিয়া ও তার অপ্রতিরোধ্য দাবি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো দুনিয়াকে উপেক্ষা করা ও দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া। এখন আমাদের জানা দরকার, দুনিয়া থেকে কিভাবে আলাদা হওয়া যায়। মনে রাখবে, দুনিয়া থেকে আলাদা হওয়ার দরকার দুটো কারণে।
প্রথমত, এতে আল্লাহর ইবাদতে স্থিতিশীলতা ও আধিক্য (অর্থাৎ বেশি বেশি ইবাদতের) লাভ হয়। কারণ দুনিয়ার আকর্ষণ ইবাদতে ইলাহী থেকে মানুষকে অন্য দিকে ব্যাপৃত রাখে। প্রকাশ্যে দুনিয়া পাওয়ার চেষ্টা আর অভ্যন্তরীণ দুনিয়া পাওয়ার লালসার ধোঁকা এ দুটো জিনিসই এমন যে, ইবাদতে ইলাহীর পথে মস্তবড় বাধাস্বরূপ। কারণ একটি নফস ও একটি অন্তঃকরণ যখন একটি কাজে ব্যাপৃত তখন তার বিপরীতটির অস্তিত্ব কোথায়? এক নফসে ও এক অন্তঃকরণে দুটো বিপরীত বিষয় থাকতেই পারে না। সুতরাং দুনিয়া নিয়ে মত্ত থাকলে আল্লাহর ইবাদতের কথা বৃথা। অধিকন্তু দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সতীনের সম্পর্ক বিদ্যমান। একজনকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলে দ্বিতীয় জন বিরক্ত হয়ে যায়। তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও দুনিয়া লাভের চেষ্টা-- এ দুটোর বৈপরীত্য পূর্ব ও পশ্চিমের ন্যায়। একদিকে অগ্রসর হলে অন্যদিকে পিছনে পড়ে যায়। পূর্ব ও পশ্চিমে একসাথে অগ্রসর হওয়া কিছুইতে সম্ভব নয়। সুতরাং দুনিয়া ও আখিরাত-- এ দুটোর যে-কোন একটার দিকে মনোযোগ দিলেই অপরটি হাতছাড়া হয়ে যাবে, এতে কোনই সন্দেহ নেই। মনে রাখা দরকার, আখিরাতের সামানা হলো ইবাদত।
এ তো গেলো অন্তরের ব্যাপার। বাইরের দিকেই লক্ষ্য করুন--দেখবেন, একই অবস্থা। যেমন হযরত আবূ দারদা (বাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ আমি একসাথে ইবাদত ও ব্যবসায়ে সাফল্য লাভের চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু দু'টো একসাথে পাওয়া গেল না। অবশেষে আমি ইবাদতকেই অবলম্বন এবং দুনিয়া পরিত্যাগ করলাম !
হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ এ দু'টো জিনিস যদি কোন ব্যক্তির নিকট একসাথে ধরা দিত, তাহলে আমার কাছেই ধরা দিত। কারণ আল্লাহ্ আমাকে শক্তি ও বিনয়- এ দু'টো জিনিসই দান করেছেন।
এতে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, দুনিয়া এবং আল্লাহর ইবাদত দু'টো একসাথে হবার নয়। সুতরাং ধ্বংসশীল জিনিসকে ত্যাগ করে চিরন্তন ও সংরক্ষিত জিনিস লাভের চেষ্টাই করা উচিত।
অবশিষ্ট হইল দুনিয়ার জন্য গোপনীয় ব্যস্ততার কথা। মানুষের সংকল্পের অনুরূপ ব্যস্ততা বিদ্যমান থাকে, যা আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করে। যেমন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত আছে- তিনি ইরশাদ করেছেন : “যে ব্যক্তি দুনিয়ার মোহে আবদ্ধ হবে আখিরাতের দিক থেকে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর যে ব্যক্তি আখিরাতের প্রতি আকৃষ্ট হবে, দুনিয়ায় সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এখানে সে খাটোই থাকবে”। সুতরাং স্থায়ী জিনিসকে অস্থায়ী ও ধ্বংসশীলের উপর অগ্রাধিকার দাও। অতএব একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যখন কেউ বাইরের দিক থেকে দুনিয়া লাভের চেষ্টা এবং অন্তরে দুনিয়ার কামনায় ব্যাপৃত থাকবে তখন সে ব্যক্তির পক্ষে পুরোপুরি আল্লাহর ইবাদতের সৌভাগ্য লাভ করা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, যখন বাহ্যত দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শনের যোগ্যতা হাসিল করবে এবং অন্তরকে তার আকর্ষণ থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে তখনই তার জন্য আল্লাহর ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করে দেবে।
হযরত সালমান ফারসী (রঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ কোন বান্দা যখন জাগতিক বিষয়ের আকর্ষণ মুক্ত হয়, তখন তার অন্তব হিকমতের আলোকে প্রজ্বলিত হয়ে যায়। আর তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও তাঁকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য সাহায্য করতে অগ্রসর হয়। সুতরাং স্থায়ী জিনিসকেই অস্থায়ী জিনিসের উপর প্রাধান্য দেয়া উচিত।
দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো এই যে, তাতে করে তোমার আমলের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং তার মর্যাদা ও সম্মানও বেশী হবে। কারণ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : “সংসার নিরাসক্ত 'আলিমের দুই রাকাআত নামায, শেষ দিন পর্যন্ত নিরত ইবাদত গোযারদের ইবাদতের চাইতেও আল্লাহ্ পাকের নিকট প্রিয় ও উত্তম”।
যে জিনিসের জন্য ইবাদত এতখানি গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাবান হয়, ইবাদতকারীদের জন্য তা হাসিল করা অত্যন্ত জরুরী। সুতরাং দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ততা অবলম্বন ও দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া তাদের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
পরবর্তী পর্ব
দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তির অর্থ কি?
📚মিনহাজুল আবেদীন -- ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
বিপদাপদের ঘাঁটি--
এরপরেই আল্লাহর ইবাদতের অভিযাত্রীকে বহুতরো বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু এসব বিপদাপদে দমে গেলে চলবে না। এগুলো অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে করে ইবাদতে ইলাহীতে স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব হয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে, বিপদাপদ চার প্রকার।
(১) দুনিয়া বর্জন
দুনিয়া ও তার অপ্রতিরোধ্য দাবি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো দুনিয়াকে উপেক্ষা করা ও দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া। এখন আমাদের জানা দরকার, দুনিয়া থেকে কিভাবে আলাদা হওয়া যায়। মনে রাখবে, দুনিয়া থেকে আলাদা হওয়ার দরকার দুটো কারণে।
প্রথমত, এতে আল্লাহর ইবাদতে স্থিতিশীলতা ও আধিক্য (অর্থাৎ বেশি বেশি ইবাদতের) লাভ হয়। কারণ দুনিয়ার আকর্ষণ ইবাদতে ইলাহী থেকে মানুষকে অন্য দিকে ব্যাপৃত রাখে। প্রকাশ্যে দুনিয়া পাওয়ার চেষ্টা আর অভ্যন্তরীণ দুনিয়া পাওয়ার লালসার ধোঁকা এ দুটো জিনিসই এমন যে, ইবাদতে ইলাহীর পথে মস্তবড় বাধাস্বরূপ। কারণ একটি নফস ও একটি অন্তঃকরণ যখন একটি কাজে ব্যাপৃত তখন তার বিপরীতটির অস্তিত্ব কোথায়? এক নফসে ও এক অন্তঃকরণে দুটো বিপরীত বিষয় থাকতেই পারে না। সুতরাং দুনিয়া নিয়ে মত্ত থাকলে আল্লাহর ইবাদতের কথা বৃথা। অধিকন্তু দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সতীনের সম্পর্ক বিদ্যমান। একজনকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলে দ্বিতীয় জন বিরক্ত হয়ে যায়। তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও দুনিয়া লাভের চেষ্টা-- এ দুটোর বৈপরীত্য পূর্ব ও পশ্চিমের ন্যায়। একদিকে অগ্রসর হলে অন্যদিকে পিছনে পড়ে যায়। পূর্ব ও পশ্চিমে একসাথে অগ্রসর হওয়া কিছুইতে সম্ভব নয়। সুতরাং দুনিয়া ও আখিরাত-- এ দুটোর যে-কোন একটার দিকে মনোযোগ দিলেই অপরটি হাতছাড়া হয়ে যাবে, এতে কোনই সন্দেহ নেই। মনে রাখা দরকার, আখিরাতের সামানা হলো ইবাদত।
এ তো গেলো অন্তরের ব্যাপার। বাইরের দিকেই লক্ষ্য করুন--দেখবেন, একই অবস্থা। যেমন হযরত আবূ দারদা (বাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ আমি একসাথে ইবাদত ও ব্যবসায়ে সাফল্য লাভের চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু দু'টো একসাথে পাওয়া গেল না। অবশেষে আমি ইবাদতকেই অবলম্বন এবং দুনিয়া পরিত্যাগ করলাম !
হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ এ দু'টো জিনিস যদি কোন ব্যক্তির নিকট একসাথে ধরা দিত, তাহলে আমার কাছেই ধরা দিত। কারণ আল্লাহ্ আমাকে শক্তি ও বিনয়- এ দু'টো জিনিসই দান করেছেন।
এতে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, দুনিয়া এবং আল্লাহর ইবাদত দু'টো একসাথে হবার নয়। সুতরাং ধ্বংসশীল জিনিসকে ত্যাগ করে চিরন্তন ও সংরক্ষিত জিনিস লাভের চেষ্টাই করা উচিত।
অবশিষ্ট হইল দুনিয়ার জন্য গোপনীয় ব্যস্ততার কথা। মানুষের সংকল্পের অনুরূপ ব্যস্ততা বিদ্যমান থাকে, যা আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করে। যেমন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত আছে- তিনি ইরশাদ করেছেন : “যে ব্যক্তি দুনিয়ার মোহে আবদ্ধ হবে আখিরাতের দিক থেকে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর যে ব্যক্তি আখিরাতের প্রতি আকৃষ্ট হবে, দুনিয়ায় সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এখানে সে খাটোই থাকবে”। সুতরাং স্থায়ী জিনিসকে অস্থায়ী ও ধ্বংসশীলের উপর অগ্রাধিকার দাও। অতএব একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যখন কেউ বাইরের দিক থেকে দুনিয়া লাভের চেষ্টা এবং অন্তরে দুনিয়ার কামনায় ব্যাপৃত থাকবে তখন সে ব্যক্তির পক্ষে পুরোপুরি আল্লাহর ইবাদতের সৌভাগ্য লাভ করা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, যখন বাহ্যত দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শনের যোগ্যতা হাসিল করবে এবং অন্তরকে তার আকর্ষণ থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে তখনই তার জন্য আল্লাহর ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করে দেবে।
হযরত সালমান ফারসী (রঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ কোন বান্দা যখন জাগতিক বিষয়ের আকর্ষণ মুক্ত হয়, তখন তার অন্তব হিকমতের আলোকে প্রজ্বলিত হয়ে যায়। আর তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও তাঁকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য সাহায্য করতে অগ্রসর হয়। সুতরাং স্থায়ী জিনিসকেই অস্থায়ী জিনিসের উপর প্রাধান্য দেয়া উচিত।
দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো এই যে, তাতে করে তোমার আমলের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং তার মর্যাদা ও সম্মানও বেশী হবে। কারণ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : “সংসার নিরাসক্ত 'আলিমের দুই রাকাআত নামায, শেষ দিন পর্যন্ত নিরত ইবাদত গোযারদের ইবাদতের চাইতেও আল্লাহ্ পাকের নিকট প্রিয় ও উত্তম”।
যে জিনিসের জন্য ইবাদত এতখানি গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাবান হয়, ইবাদতকারীদের জন্য তা হাসিল করা অত্যন্ত জরুরী। সুতরাং দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ততা অবলম্বন ও দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া তাদের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
পরবর্তী পর্ব
দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তির অর্থ কি?
তওবার মকাম (পর্ব- ৭)

Comments
Post a Comment