তওবার মকাম (পর্ব- ৮) দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তির অর্থ কি?
দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তির অর্থ কি?
দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি বলতে কি বোঝায় এবং তার খাঁটি রূপই বা কি— এক্ষণে তা-ই আলোচনা করা যাক।
আমাদের উলামায়ে কিরামের নিকট উহা দুই প্রকার। এক প্রকারের নিরাসক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা মানুষের আওতাধীন, ইচ্ছা করলে সে তা কার্যকর করতে সক্ষম। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারটি মানুষের ক্ষমতার বাইরে।
মানুষের আয়ত্তাধীন নিরাসক্তি তিন রকমে কার্যকর হতে পারে - প্রথমত, যা নেই, তাকে পাওয়ার চেষ্টা ত্যাগ করা। দ্বিতীয়ত, যা কিছু জমা হয়েছে, তা পৃথক করে দেয়া এবং তৃতীয়ত, সে সবের প্রতি সকল আকাঙ্ক্ষা ও কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা।
এরপর আসে মানুষের ক্ষমতার বাইরে থেকে যে নিরাসক্তি সৃষ্টি হয়, তার কথা। এ অবস্থাটি মানুষের মনে কোন একটি বিষয়ে সন্তুষ্টির ভাব সৃষ্টি করে দেয়। তবে মনে রাখতে হবে, মানুষের আয়ত্তাধীন যে কাজটুকু তাকেই দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি সৃষ্টির প্রথম পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করতে হবে; এর ফলেই দ্বিতীয় প্রকার, যেটা মানুষের আয়ত্তে বাইরে, তাও এসে যাবে। শেষোক্ত অবস্থাটি অত্যন্ত উঁচু দরজার।
মানুষ যখন এ অবস্থাটি হাসিল করতে সক্ষম হয় অর্থাৎ দুনিয়ার যা কিছু তার আয়ত্তের মধ্যে, তাকে লাভ করার চেষ্টা পরিত্যাগ করে, দুনিয়ার যে সকল জিনিস তার নিকট জমা হয়েছে, তা বন্টন করে দেয় এবং অন্তর থেকে সে সবের আকাঙ্ক্ষা ও তাদের উপরের কর্তৃত্বাধিকার আল্লাহ্ তা'আলার নিকট থেকে সওয়াবের আশায় এবং অন্যান্য বিপদ-মুসিবতের বিষয়কে স্মরণ রেখে সব কিছু বিসর্জন দিতে সক্ষম হয়, তখন তার অন্তরে দুনিয়ার প্রতি ঘৃণা বদ্ধমূল হয়ে যায়। মানুষের ঠিক এ অবস্থার নাম দুনিয়ার প্রতি খাটি নিরাসক্তি।
উপরিউক্ত তিনটি স্তরের মধ্যে শেষোক্তটি পালন করা খুবই কঠিন। অর্থাৎ অন্তর থেকে সকল আকর্ষণ বিসর্জন দেয়া। অনেক সময় দেখা যায় যে, বহু লোক বাহ্যত দুনিয়াকে পরিত্যাগ করেছেন, তার প্রতি ঔদাসীন্য প্রকাশ করেছেন ঠিকই, কিন্তু অন্তরে পোষণ করে চলেছেন দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ, ভালবাসা ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা । এ অবস্থাটি নফসের পক্ষে খুবই মারাত্মক ও ক্লেশপূর্ণ । আর সকল কিছু নির্ভরও করে এ অবস্থাকে কাটিয়ে উঠার উপর। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেন :
“এ আখিরাতের ঘর আমি বানিয়েছি তাদেরই জন্য, যারা দুনিয়ায় অহংকার ও ফাসাদ করতে চায় না”।
(সূরা কাসাসঃ ৮৩)
লক্ষণীয় যে, উপরিউক্ত আয়াতের ইচ্ছার অনুপস্থিতিকেই সিদ্ধান্তের জন্য নির্ভরশীল করা হয়েছে। দুনিয়া অর্জনের চেষ্টা বা আখিরাত পাওয়ার জন্য কোন ক্রিয়ার কথা উল্লেখ পর্যন্ত করা হয়নি।
অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন :
“যে কেউ আখিরাতের ফসল কামনা করে তার জন্য আমি তার ফসল বর্ধিত করে দেই এবং যে কেউ দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে এরই কিছু দেই, আখিরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না”। (সূরা শূরাঃ ২০)
“আর যে ব্যক্তি দুনিয়ায় ভাল চায়, তাকে আমার ইচ্ছানুযায়ী দুনিয়ায়ই অতি তাড়াতাড়ি তা দান করি”।
(সূরা বনী ইসরাঈল : ১৮)
আল্লাহ্ পাক আরও বলেনঃ
“আর যে ব্যক্তি আখিরাতের কল্যাণ প্রত্যাশা করে এবং সেজন্য যথারীতি চেষ্টা করে— সে যদি মুমিন হয়, তবে এ ধরনের ব্যক্তিদের প্রচেষ্টা কবূল করা হয়”।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহে সর্বত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সংকল্পের প্রতিই ইঙ্গিত দিয়েছেন। সুতরাং এক্ষেত্রে সংকল্পের গুরুত্বের আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। বিষয়টি কঠিন, সন্দেহ নেই। কিন্তু বান্দা যদি 'যাহা নাই' তার জন্য প্রচেষ্টা থেকে বিরত ও দুনিয়ার সাথে সম্পর্কছেদের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে তাতে স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে, তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাকে দুনিয়ার এরাদা ত্যাগ করার তৌফিক দিয়ে তার অন্তরকে এদিকে ধাবিত করাবেন। কেননা তিনিই বান্দার প্রতি অনুগ্রহ ও করুণা প্রদর্শনকারী। দুনিয়াকে পরিত্যাগ করার জন্য নিজের মনে উৎসাহ সৃষ্টির
উদ্দেশ্যে দুনিয়ার খারাপ দিকগুলো অধিক আলোচনা এবং সেই সম্পর্কে জ্ঞানী, গুণীদের বিভিন্ন অভিমত অধিক স্মরণ করবে। দুনিয়ার কদর্যতা ও খারাবি সম্পর্কে আলিমগণ বহু মন্তব্য করে গেছেন। তাঁদের কেউ বলেছেনঃ দুনিয়ার পাপমত্ততা ও সর্বত্র নাফরমানী ভাব দেখে এবং তাতে অংশগ্রহণকারীদের অবিলম্বে অপমানিত হতে হবে জেনে আমি দুনিয়া পরিত্যাগ করেছি।
উপরিউক্ত মন্তব্যটিতে যেন দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণের ভাব প্রকাশ পায়। কারণ যে ব্যক্তি বিচ্ছেদের জন্য অভিযোগ উত্থাপন করে, তার মনে থাকে মিলনের কামনা। তেমনি যে ব্যক্তি কোন বিষয়কে সংখ্যাধিক্যের অংশ গ্রহণের কারণে পরিত্যাগ করে, তার কামনা থাকে সে জিনিসকে একা পাওয়ার।
সুতরাং দুনিয়া সম্পর্কে উক্ত মন্তব্য থেকে যেন এক ধরনের দুর্গন্ধই নাকে আসে। বরং এ সম্পর্কে আমাদের শায়খের মন্তব্যই অধিক পছন্দনীয়। তিনি বলেছেনঃ দুনিয়া আল্লাহ্ দুশমন। সুতরাং দুনিয়াকে তুমি কি করে ভালবাসতে পার? অথচ কেউ যদি কাউকে ভালবাসে, তাহলে সেই প্রিয়পাত্রের দুশমনের প্রতি তার স্বভাবতই ঘৃণা থাকার কথা। তিনি আরও বলেছেনঃ দুনিয়া একটি বিকৃত লাশ। তুমি কি জান না যে, দুনিয়ার চূড়ান্ত পর্যায় হলো বিপর্যয়? প্রকৃত কথা এই যে, দুনিয়া পুঁতিগন্ধময়, পংকিলতাপূর্ণ একটি সম্পূর্ণ অপবিত্র জায়গা। কিন্তু লালসাপূর্ণ সামগ্রী, ঐশ্বর্য ও মোহনীয় জিনিস দিয়ে একে করা হয়েছে জৌলুসপূর্ণ। ফলে অচেতন মানুষ এতেই ধোঁকায় পতিত হয়েছে, আর সচেতন বুদ্ধিমানরা এ থেকে দূরে সরে গেছে।
মোটকথা, আমাদের মতে দুনিয়ায় যা হালাল ও হারাম - এতদুভয়ের ব্যাপারেই নিরাসক্তি প্রদর্শন করা যেতে পারে। হারামের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন নফলের পর্যায়ে পড়ে। হারাম পরিত্যাগ আল্লাহর রাহে স্থিতিশীলতা অর্জনকারীদের জন্য মল ও দুর্গন্ধময় বস্তু ত্যাগ ছাড়া আর কিছু নয়। তবে প্রয়োজনের খাতিরে কেবল কোন ক্ষতির আশঙ্কাকে দূরীভূত করার জন্য তার প্রতি আগ্রহশীল হতে পারে। আর যা হালাল, তার প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন তো ওলী-আল্লাহ্ নিদর্শন। কেননা তাঁদের নিকট হালাল বিষয়ও লাশের পর্যায়ভুক্ত। তারা কেবল প্রয়োজনের তাকীদেই তা থেকে প্রয়োজন মত ফায়দা গ্রহণ করে থাকেন। ওলী-আল্লাহর কাছে হারাম বিষয় দোযখের ন্যায়ই প্রতীয়মান হয়। তাঁদের মনে তৎপ্রতি আগ্রহের সামান্যতম ছায়াও প্রবেশ করতে সক্ষম নয়। এ অবস্থাকেই বলা হয় 'মনের নিরাসক্ত ভাব'। এ সময় মনে এ সব বিষয়ের প্রতি কোন আগ্রহ বা আসক্তি বিদ্যমান থাকে না এবং তৎপ্রতি ঘৃণা ও বিরক্তি জমতে থাকে। অবশেষে এসবের প্রতি সামান্যতম আকাঙ্ক্ষাও সম্পূর্ণরূপ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
যদি কারো মনে জাগে যে, যে দুনিয়া এমন অপরূপ লালসা ও কামনার সামগ্রীতে ভরা, যার জন্য মানুষ একেবারে মত্ত এবং পাগল, তা কি করে দোযখ, অপবিত্র ও দুর্গন্ধময় লাশ সদৃশ হতে পারে?
এ সম্পর্কে একটি কথাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ্ যাকে বিশেষ তৌফিক দান করেছেন, তিনি অতি সহজেই দুনিয়ার আসল রূপ, তার অপবিত্রতা ও পুঁতিগন্ধময়তা ধরে ফেলতে পারেন – তাঁর কাছে দুনিয়ার এ দুর্গন্ধময় লাশ সদৃশ রূপটি কিছুতেই গোপন থাকতে পারে না। বরং দুনিয়ার এ আসল রূপ যারা ধরতে পারে না, তার কৃত্রিম জৌলুসে যারা মাতোয়ারা হয় এবং লালসার ধোঁকায় নিপতিত হয়ে যারা অন্ধভাবে দিন গুজরান করতে থাকে – পূর্বোক্ত লোক তাদের দেখে কেবল বিস্ময়ই বোধ করে। এ প্রসঙ্গে একটি উপমা দিয়ে বিষয়টিকে আমি আরও পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
ধরুন, কোন এক দোকানদার খুব সুন্দর করে রসগোল্লা তৈরী করল, কিন্তু তাতে কিছু বিষ মিশিয়ে দিল। একই সাথে দুই ব্যক্তি সেখানে অবস্থান করছিল। এক ব্যক্তি ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করল – অপর ব্যক্তির দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ হলো না । অতঃপর দোকানদার রসগোল্লাগুলো থালায় সাজিয়ে তাদের সামনে উপস্থিত করল। যে ব্যক্তি রসগোল্লায় বিষ মিশিয়ে দিতে দেখেছে, সে তো নিশ্চয়ই তা স্পর্শও করবে না। তার কাছে এ জিনিস রসগোল্লা হয়েও অগ্নিবৎ, বরং তার চেয়েও ভয়ঙ্কর বোধ হবে এবং এতে যে বিষ আছে, এ সম্পর্কে তার মনে সন্দেহও সৃষ্টি হবে না। সুতরাং সে কখনো ধোঁকায় পড়বে না। সে এর গোপন রহস্য জানে। তাই এ রসগোল্লা বাহ্যিকভাবে যত লোভনীয়ই হোক, তাতে সে বিভ্রান্ত হতে পারে না।
কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তি—যে বিষের কথা জানে না, সে অবশ্যই রসগোল্লার বাহ্যিক লোভনীয়তা দেখে বিভ্রান্ত হবে এবং লোভের বশবর্তী হয়ে ধৈর্য ও সহা-ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। শুধু তাই নয়, সে হয়তো তার উল্লিখিত সাথীর ব্যবহারে আশ্চর্যই বোধ করবে। এমনকি দ্বিতীয় ব্যক্তিই হয়তো প্রথম ব্যক্তিকে একজন বেওকুফ মনে করে বসবে। আল্লাহর পথের অভিযাত্রী ও তাতে স্থিতিশীলতা অর্জনকারী এবং দুনিয়াদার মানুষের অবস্থাও সব সময় অনুরূপ হয়ে থাকে।
এখন কথা হলো, যদি উক্ত রসগোল্লায় বিষ না দিয়ে থুথু জাতীয় অপবিত্র জিনিস মিশিয়ে খুব উত্তমভাবে তা সাজিয়ে দেয়া হয়, তাহলে যে তা প্রত্যক্ষ করেছে, সে তাও স্পর্শ করবে না। সে এ রসগোল্লাকেও ঘৃণিত বস্তু বলে মনে করবে; বিশেষ প্রয়োজন এবং নেহায়েত জরুরী না হলে সে তৎপ্রতি কোনই আকর্ষণ অনুভব করবে না। অপরপক্ষে যে কোন অপবিত্র জিনিস মিশিয়ে দিতে দেখেনি, সে রসগোল্লার বাইরের পারিপাট্য দেখে ধোঁকায় নিপতিত এবং লোভের বশবর্তী হয়ে আনন্দে আত্মহারা হবে। দুনিয়ার হালাল বিষয় সম্পর্কে এই শেষোক্ত উদাহরণটি প্রযোজ্য।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন ও সংযমী এবং লিপ্সাওয়ালা ও দুর্বলমনা – এ উভয় শ্রেণীর মানুষেরই প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য একই রকম হওয়া সত্ত্বেও তাদের অবস্থার মধ্যে বিভিন্নতা সৃষ্টি হলো। কারণ এক শ্রেণী জ্ঞান ও দৃষ্টিশক্তি কাজে লাগিয়েছে, আর অপর শ্রেণী মূর্খতা ও ঔদাসীন্যকে প্রশ্রয় দিয়েছে। শেষোক্ত শ্রেণীও যদি জ্ঞান ও দৃষ্টিক্ষমতা সম্প্রসারিত করে, যাহেদ যা অবলম্বন করেছেন – তবে তাদের অবস্থাও তেমনই হবে। অপরপক্ষে যদি যাহেদ স্বীয় দৃষ্টি ও সংযম কাজে না লাগায়, তবে তার অবস্থাও লিপ্সু ও মূর্খের ন্যায়ই হবে। সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে, ভাল-মন্দের পার্থক্য বিচার করে নেয়াটি স্বভাবের উপর নির্ভর করে না – নির্ভর করে জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির উপর। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য দূরদৃষ্টি প্রয়োগ করে চলার পন্থাটিই অত্যন্ত উপকারী ও পরম বাঞ্ছিত। যার মধ্যে সামান্যতমও বিবেক ও ন্যায় বিচারের ক্ষমতা আছে, সে নিশ্চয়ই এ পন্থাটি অবলম্বন করবে। বাকী হিদায়ত আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর পরম অনুগ্রহ ও করুণার দ্বারা পূর্ণ করে দেবেন।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, দুনিয়ারও তো কিছু প্রয়োজন আছে। কারণ বেঁচে থাকার জন্য শক্তি সঞ্চয় করতেই হয়। সুতরাং পূর্ণ 'যুহদ' তাহলে কিভাবে হাসিল করা সম্ভব?
এ প্রশ্নের জবাব এই যে, জীবন ধারণের জন্য যার প্রয়োজন নেই, সে বিষয় পরিত্যাগ করলেই চলবে। মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার ততটুকুই গ্রহণ করা যাবে যা শুধু জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজন অর্থাৎ প্রকৃত লক্ষ্য থাকবে শুধুমাত্র জীবনী শক্তিকে সজীব রাখা। কেননা আল্লাহর ইবাদত করার জন্যও এ শক্তির প্রয়োজন আছে। কিন্তু খানাপিনা ও স্বাদ গ্রহণই যেন সার হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ এটা প্রকৃত লক্ষ্য নয়। আর তাছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা ইচ্ছা করলে কোন জিনিস বা কোন কারণের মাধ্যমেও যেমন শক্তি দান করতে পারেন, তেমনি বিনা উপাদান ও বিনা কারণেও শক্তি প্রদান করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ ফেরেশতাদের কথা উল্লেখ করা যায়।
আর যদি শক্তি ও সামর্থ্য কোন উপাদানের ভিত্তিতে দান করা হয়, তবে তাও দুই রকমের হতে পারে। প্রথমত, মানুষের চেষ্টা, অনুসন্ধান ও কামাইকৃত উপাদানের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা শক্তি ও সামর্থ্য দান করতে পারেন। আর দ্বিতীয়ত, তিনি যদি চান, তাহলে মানুষের কল্পনারও বাইরে, অনুসন্ধানেরও ঊর্ধ্বে, মানুষের আয়ত্তের বহির্ভূত কোন উপাদানের মাধ্যমেও শক্তি ও সামর্থ্য দান করতে পারেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কেই ইরশাদ করেছেন :
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্য কোন-না- কোন একটি পন্থা বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করেন, যে জায়গা সম্পর্কে কল্পনাও করতে সক্ষম নয়”।
(সূরা তালাকঃ ২-৩)
এমতাবস্থায় চেষ্টা ও অনুসন্ধানের তো কোনই সুযোগ বিদ্যমান থাকে না। যা হোক, এ উচ্চ পর্যায়ের যুহদ' যদি হাসিল না করতে সক্ষম হও আর চেষ্টা ও তদবীরেরই প্রয়োজন হয় রিযিকের জন্য, তবুও চেষ্টা তদবীরসহ অকুতোভয়ে আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাওয়া উচিত। তবে লক্ষ্য থাকবে – চেষ্টা ও তদবীরের উদ্দেশ্য যেন ভোগ-লিপ্সায় পর্যবসিত না হয়। - কেননা তা হলে ভোগ-লিপ্সা ব্যতীত তোমার চেষ্টা ও তদবীরকেও উত্তম কাজের মধ্যেই পরিগণিত করা হবে এবং এগুলোতেও আখিরাতের জন্য চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধরা হবে। অবশ্য দুনিয়ার প্রতি ঝোঁক-প্রবণতা থেকে তা সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতেই হবে । ঠিক এমনি অবস্থায় পৌছাতে পারলে তোমার দুনিয়ার প্রতি বৈরাগ্য হাসিল (যুহদ) সম্পর্কে আর কোন তর্কের অবকাশ থাকবে না। তবে অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, এ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোকে আল্লাহর উপর ভরসা করে অতি উত্তমভাবে বুঝে নিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী শান্ত ও নিরাসক্ত মনে আমল করতে হবে।
(সমাপ্ত ) 📚 মিনহাজুল আবেদীন
——————

Comments
Post a Comment