চরিত্র সংশোধন (৬) কুস্বভাবের কারণ ও মধ্যপন্থা



চরিত্র সংশোধনের সাধনা ও কুস্বভাব বর্জনের উপায়- (পর্ব - ৬)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কুস্বভাবের কারণঃ ও মধ্যপন্থা
উক্ত চারিটি শক্তির সমুদয়ই কুৎসিত হইয়া গেলে স্বভাবও পূর্নরূপে কুৎসিত হইয়া যায় এবং এইরূপ স্বভাববিশিষ্ট লোক দ্বারা সর্ববিধ কুকর্ম সংঘটিত হয় । দ্বিবিধ কারণে এই শক্তিসমূহ বিশ্রী ও জঘন্য হইয়া পড়ে । প্রথমত প্রত্যেকটি শক্তি যে পরিমাণে বিকশিত ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া উচিত, ইহা সীমা অতিক্রম করিয়া গেলে ইহা বিশ্রি ও জঘন্য হইয়া যায়। দ্বিতীয়ত প্রত্যেকটি শক্তি যে পরিমাণে বিকশিত ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া উচিত সেই সীমা হইতে হ্রাসপ্রাপ্ত হইয়া বিকল ও শক্তিহীন হইয়া গেলেও ইহা বিশ্রি ও জঘন্য হইয়া থাকে।
জ্ঞানশক্তি সীমা অতিক্রম করিয়া বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইলে এবং মন্দ কার্যে ইহাকে নিয়োজিত করিলে ইহা হইতে তখন প্রতারণা, কপটতা ও জ্ঞান-গর্ব জন্ম হইয়া থাকে। ইহাই আবার পরিমিতরূপে বিকশিত না হইয়া খর্ব হইয়া গেলে নির্বুদ্ধিতা, মূর্খতা ও হঠকারিতা উৎপন্ন হয়। সেই জ্ঞানশক্তি পরিমিতরূপে বিকশিত না হইয়া খর্ব হইয়া গেলে নির্ভূদ্ধিতা, মূর্খতা ও হঠকারিতা উৎপন্ন হয় । সেই জ্ঞানশক্তি পরিমিতরূপে বিকশিত ও স্ফূর্ত হইলে মানুষ উত্তমরূপে কার্যাদি পরিচালন ও বিচারে অভ্রান্ত অভিমত প্রকাশ করিতে পারে এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহন ও দূরদর্শিতা অর্জন করিতে সমর্থ হয়।
ক্রোধ সীমা ছাড়াইয়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে দুঃসাহসিকতা জন্মে; আবার পরিমিতরূপে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত না হইলে কাপুরুষতা ও ভীরুতা উৎপন্ন হয়। আবার ক্রোধ পরিমিতরূপে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া অত্যল্পতা ও অত্যধিকতার দোষে দুষ্ট না হইলে সৎসাহস উৎপন্ন হইয়া থাকে। এই সৎসাহস হইতে বদান্যতা, বীরত্ব, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, নির্ভয়তা, ক্রোধ নিবারণের শক্তি এবং তদনুরূপ অন্যেন্য সৎস্বভাব উৎপন্ন হইয়া থাকে ।
ক্রোধ সীমা অতিক্রম করিয়া বর্ধিত হইলে দুঃসাহসিকতা উৎপন্ন হয়, মানুকে বিপদসঙ্কুল কার্যে নিক্ষেপ করে এবং তখন তদনুরূপ কুস্বভাবসমূহ উৎপন্ন হয়। ক্রোধের সল্পতার দরুন কাপুরোষতা ও ভীরুতা জন্মে এবং ইহা হইতে আবার আত্ম-অমর্যাদা, অসহায়তা, পরপদ-লেহন, চাটুকারীতা ইত্যাদি কুস্বভাব উৎপন্ন হয়।
সেইরূপ কামশক্তি বা লোভ-লালসা সীমার অতিরিক্ত বৃদ্দি পাইলে দুরাশা দুরাকাঙ্ক্ষা জন্মে। ইহা হইতে কামুকতা, অপবিত্রতা, কলুসতা, অকৃতজ্ঞতা ধনীদের নিকট দীনতা-হীনতা স্বীকার এবং দীনহীন দরিদ্রের প্রতি অবজ্ঞা জন্মে। আর তদনুরূপ মন্দ স্বভাবগুলি পরষ্পর মিলিয়া মিশিয়া মানুষকে কুস্বভাবী করিয়া তোলে। আবার এই কামশক্তি বা লোভ-লালসা নিয়মিত ও পরিমিতরূপে বিকাশপ্রাপ্ত হইয়া #মধ্যপন্থা অবলম্বন করিলে ইহাকে পরহেজগারী বলিয়া অভিহিত করা হয়। এই পরহেজগারী হইলে লজ্জা, অল্পে তুষ্টি, সরলতা, সহিষ্ণুতা, রসজ্ঞতা, অপরের মন আকর্ষনের ক্ষমতা ও গুনগ্রাহিতা ইত্যাদি সদগুন উৎপন্ন হইয়া থাকে।

মধ্যপন্থা
মোটের উপর ঐ সকল শক্তি বা বৃত্তির দুই প্রান্ত রহিয়াছে এবং এই উভয় প্রান্তই খারাপ । এই দুই প্রান্তের ঠিক মধ্যস্থলে চুল অপেক্ষা সূক্ষ্ম একটি সরল ও উৎকৃষ্ট মধ্যপন্থা রহিয়াছে, ইহাকে সিরাতুল মুস্তাকীম বা মধ্যপথ বলে । ইহা পুলসিরাত সদৃশ সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ ধারবিশিষ্ট । যিনি জীবদ্দশায় এদিক ওদিক না হইয়া সোজা এই মধ্যপথ অবলম্বন করিয়া চলিয়াছেন , তিনি নিরাপদে ও নির্ভয়ে পুলসিরাত অতিক্রম করিয়া যাইবেন । এই জন্যই আল্লাহ্ মানুষকে স্বভাবে উক্ত উভয় প্রান্ত পরিত্যাগ করত মধ্যপথ অবলম্বনের আদেশ প্রদান করিয়া বলিয়াছেন “এবং তাহারা যখন ব্যয় করে, অপব্যয় করে না ও কৃপণতাও করে না, (বরং) এতদুভয়ের মধ্যপথে দৃঢ়পদে দণ্ডায়মান থাকে ।” (সূরা ফুরকান, রুকু -৬)
রাসূলে মাকূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-কে লক্ষ্য করিয়া আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, “এবং আপনি নিজের হাত নিজের গলার সহিত বাঁধিয়া রাখিবেন না, আর ইহাকে সম্পূর্ণভাবে খুলিয়াও দিবেন না; (যাহাতে আপনার সমস্তই ব্যয় হইয়া যায় এবং আপনি অভাবগ্রস্ত হইয়া পড়েন ।")
(সূরা বানী ইসরাঈল, রুকূ ৩, পারা ১৫)
দেহের বাহ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের আকৃতি পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সুন্দর হইলেই যেমন মানুষকে সর্বাঙ্গ সুন্দর বলা যায় তদ্রুপ আভ্যন্তরীণ বৃত্তিগুলিই অনুমিতরূপে মধ্যপথ অবলম্বন করিয়া বিকশিত হইলেই স্বভাবকে সর্বাঙ্গ সুন্দর বলা যাইতে পারে ।


Comments