চরিত্র সংশোধন (৩১) প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ আন্তরিক রোগের মহৌষধ ও শ্রেষ্ঠ জিহাদ
চরিত্র সংশোধনের সাধনা ও কুস্বভাব বর্জনের উপায়- (পর্ব - ৩১)
প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ আন্তরিক রোগের মহৌষধ ও শ্রেষ্ঠ জিহাদ-
চিকিৎসায় সুফল লাভ করিতে হইলে প্রথমেই রোগ নির্ণয় করিয়া লওয়া দরকার । রোগ না চিনিয়া ঔষধ প্রয়োগ করা যায় না । প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ করাই সর্ববিধ হৃদরোগের মহৌষধ । এইজন্য আল্লাহ্ বলেন : “এবং যে ব্যক্তি (স্বীয়) আত্মাকে কু-প্রবৃত্তি হইতে দমিত রাখিয়াছে অবশ্যই বেহেশত তাহার বাসস্থান” (সূরা নাযিআত, রুকু ২) । একদা রাসূলে মাক্বূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) জিহাদ হইতে প্রত্যাবর্তন করত সাহাবা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “আমরা ক্ষুদ্র জিহাদে জয়ী হইয়া আসিলাম, না বৃহৎ জিহাদে ?” সাহাবা (রা) নিবেদন করিলেন- “ইয়া রসূলাল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম), বৃহৎ জিহাদ কাহাকে বলে ?” রাসূলে মাবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলিলেন- “প্রবৃত্তির সঙ্গে লড়াই করাকে বৃহৎ জিহাদ বলে ৷” রাসূলে মাবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন- “পরিশ্রমে তোমরা দুঃখিত হইও না এবং আল্লাহ্'র অবাধ্যতায় তোমরা মনকে মোটেই অবকাশ দিও না । যদি দাও, তবে তাহাকে অন্যায় কাজে অবকাশ দিয়াছ বলিয়া সে কিয়ামতের দিন তোমার সহিত ঝগড়ায় প্রবৃত্ত হইবে এবং তোমাকে তিরস্কার করিতে থাকিবে । এমনকি এই কারণে তোমার এক অঙ্গ অন্য অঙ্গের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধাইয়া লা'নত করিয়া বলিবে আমাকে অন্যায় কাজে অবকাশ দিয়াছিলে কেন ?"
হযরত হাসান বসরী (র) বলেন- “নিতান্ত অবাধ্য ও দুর্দমনীয় পশুকে যেমন সুদৃঢ় লাগাম দিয়া রাখিতে হয়, তদপেক্ষা মজবুত ও কঠিন লাগাম দ্বারা মানুষের মনকে সর্বদা আবদ্ধ রাখা কর্তব্য ।” হযরত সররি সকতী (র) বলেন, “আখরোট ফল মধুতে ডুবাইয়া ভক্ষণ করিবার জন্য আমার মন চল্লিশ বৎসর যাবত আকাঙ্ক্ষা করিতেছে; কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি ভক্ষণ করি নাই ।” হযরত ইবরাহীম খাওয়াস (র) বলেন- “লাগাম পর্বতে গমনের পথে বহু ডালিমবৃক্ষে অসংখ্য সুন্দর পাকা ডালিম ঝুলিতেছে দেখিতে পাইলাম । ইহা দেখিয়াই আমার ডালিম খাইবার ইচ্ছা হইলে একটি ডালিম পাড়িয়া দানা মুখে দিলাম । কিন্তু ইহা নিতান্ত টক ছিল বলিয়া খাইতে না পারায় ফেলিয়া দিয়া পথ চলিতে লাগিলাম । কিয়দ্দূর অগ্রসর হইয়া দেখিতে পাইলাম, এক ব্যক্তি রাস্তায় পড়িয়া রহিয়াছেন এবং অগণিত বোল্তা তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া দংশন করিতেছে । আমি তাঁহাকে ‘আস্সালামু আলায়কুম' বলিয়া অভিবাদন করিলাম । তিনি ‘ওয়া আলায়কাস্সালাম ইয়া ইবরাহীম' বলিয়া জওয়াব দিলেন । আমি ইহাতে বিস্মিত হইয়া বলিলাম- ‘হে দরবেশ, কিরূপে আপনি আমাকে চিনিলেন ?' তিনি বলিলেন- "যে আল্লাহকে চিনে তাহার নিকট কিছুই গোপন থাকে না ।" আমি বলিলাম- "বুঝিলাম আল্লাহ্'র সহিত আপনার প্রগাঢ় সম্বন্ধ রহিয়াছে অর্থাৎ আপনি তাঁহার বিশেষ প্রিয়পাত্র । তবে কেন বোলতার দংশন হইতে মুক্তিলাভের জন্য তাঁহার নিকট প্রার্থনা করেন না ?' তিনি উত্তর দিলেন "আপনিও ত আল্লাহ্'র একজন বিশেষ প্রিয়পাত্র । আপনি কেন ডালিম ভক্ষণের অভিলাস হইতে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করিলেন না ? ডালিমের অভিলাষরূপ বোলতার দংশনের ক্ষত ত পরলোকে প্রকাশিত হইবে এবং অত্যন্ত যন্ত্রণা দিবে; অপরদিকে, এই বোলতার দংশনের ক্ষত এই জড় জগতেই শেষ হইয়া যাইবে ।”
পরবর্তী পর্ব
প্রবৃত্তি দমনের উপকারিতা

Comments
Post a Comment