জিলহজ মাসের ১৩ দিনের বিশেষ আমল

 


আরবি ১২ মাসের সর্বশেষ মাস হল জিলহজ মাস। এ মাসের প্রথম ১৩ দিনের বিশেষ আমল কোরআন-হাদিসে বর্ণিত আছে।

যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো—

হজ :

জিলহজ মাসের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হজ। হজ ইসলামের মৌলিক পাঁচ স্তম্ভের একটি। এর মূল কাজগুলো ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। হজ সামর্থ্যবানদের ওপর জীবনে একবার ফরজ হয়। যা একবার ফরয হলে পরবর্তীতে সম্পদহারা হলেও ফরয রয়ে যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার জন্য অবশ্যকর্তব্য। আর যে (এই নির্দেশ পালন করতে) অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত যে আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি সামান্যও মুখাপেক্ষী নন। ’ (সুরা আলে ইমরান)

হাজীরা উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করবে। এবং পশু কুরবানী করবে (তিরমিযি ইবনে মাযাহ ) তালবিয়া হল “লাব্বাইকা আল্লা-হুম্মা লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলকা, লা-শারীকা লাকা”। (সুনান আত তিরমিজী -বুখারী,মুসলিম)


যেহেতু হজে যেতে হলে আগে নিবন্ধন করতে হয়। নিবন্ধনের পর সিরিয়াল পেতে পেতে  সময় লেগে যায়। তাই যে বছর হজে যাওয়ার দৃঢ়সংকল্প আছে—তার আগেই নিবন্ধন করতে হবে এবং সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরী।
 
কোরবানি : 

এ মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল কোরবানি, যা ১০, ১১ বা ১২ তারিখে সম্পন্ন করতে হয়। এবং তা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর ওয়াজিব—যিনি সাবালক ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)তিনি সরাসরি কোরবানির ব্যাপারে নির্দেশিত হয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন, "(ওহে হাবীব) আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।" (সুরা কাউসার)
আবূ হুরাইরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, "সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানী করে না, সে যেন অবশ্যই আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়"। (মুসনাদ আহমাদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম

এই হাদিসের থেকে অনুমান করা যায় কুরবানী করা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ। 

আর যাদের ওপর ওয়াজিব হয়নি, তারাও চাইলে সুন্নত হিসেবে কোরবানি করতে পারবে।
 
বেশি বেশি নেক আমল করা : এ মাসের প্রথম ১০ দিনের যেকোনো নেক আমল আল্লাহর অনেক প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, "যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল, অনান্য দিনের আমলের তুলনায় উত্তম"। (বুখারি)
তাই প্রতিটি মুহূর্তে কোনো না কোনো নেক আমল করতে থাকা উচিত। যে কাজই করি তা যেন হয় ইহকালীন বা পরকালীন কোনো কল্যাণের। পাশাপাশি গুনাহ থেকে বিরত থাকাও বিশেষভাবে জরুরি।
 রোজা :
প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা : জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। এর প্রথম ১০ রাতে ইবাদত করা উত্তম। 
 
আরাফার দিন রোযা পালনের ফযীলত  

আরাফার দিন তথা ৯ জিলহজ রোজা রাখলে দুই বছরের (সগিরা) গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তাই এ দিন রোজা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা উচিত। নবীজি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে তিনি আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।  সুনান আত তিরমিজী,  সুনান ইবনু মাজাহ,  মুসলিম,

অতএব যেহেতু  তখন রোজা রাখলে এ ফজিলত লাভ করবে, ইনশাআল্লাহ। তবে যারা ইহরাম অবস্থায় থাকবে তাদের জন্য রোযা রাখার বিধান নেই। বরং হারাম বলা হয়েছে। কারণ সেই দিন হল হাজীদের জন্য ঈদের দিন। (তফসীরে ইবনে কাসীর ২:২০৩) বিভিন্ন হাদিসের রেফারেন্স বিদ্যমান।

 
নখ-চুল ইত্যাদি না কাটা

যারা কোরবানি করার ইচ্ছা করবে তাদের জন্য জিলহজ মাসের প্রথম থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত নখ-চুল ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘যখন জিলহজের প্রথম দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কোরবানি করবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।’ (সুনান আবূ দাউদ)
তবে কোরবানি করতে অক্ষম ব্যক্তি ঈদের পর চুল ও নখ কাটবে, গোঁফ ছোট করবে এবং নাভীর নীচের লোম ইত্যাদি কাটলে তার পূর্ণ একটি কোরবানির সওয়াবের কথা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। (সুনান আবূ দাউদ)
এমনকি এ সময় বাচ্চাদের নখ-চুল কাটা থেকে বিরত থাকাও ভালো। অতএব জিলহজ আগমনের আগেই নখ-চুল ইত্যাদি কেটে পরিপাটি হয়ে থাকা বাঞ্ছনীয়।
 
তাকবিরে তাশরিক পড়া : 

৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত নামাজ। এর প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। চাই জামাতে নামাজ পড়া হোক বা একাকি, পুরুষ হোক বা নারী, মুকিম হোক বা মুসাফির। তাকবিরে তাশরিক পুরুষের জন্য জোরে পড়াও ওয়াজিব। তাকবিরে তাশরিক হলো, ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ’।
 
ঈদুল আজহার নামাজ পড়া : 

ঈদুল আজহার নামাজ প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন পুরুষের ওপর ওয়াজিব। সূর্যোদয়ের ২০-৩০ মিনিট পর থেকে দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত ঈদের নামাজ পড়া যায়। নবীজি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ঈদুল আজহার নামাজ সাধারণত সূর্যোদয়ের আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে আদায় করতেন। ঈদুল আজহার নামাজ একটু তাড়াতাড়ি পড়াই উত্তম। তবে প্রয়োজনে কিছুটা বিলম্ব করাও নিষিদ্ধ নয়।

ঈদের নামাজের নিয়ম নীতি

Comments

Popular posts from this blog

চরিত্র সংশোধন (১৩) আন্তরিক ব্যাধির ঔষধ ও প্রয়োগ বিধি

চরিত্র সংশোধন (১০) কুম্বভাবের প্রতিষেধক

চরিত্র সংশোধন (৮) ক্রোধ ও লোভকে আজ্ঞাবহ রাখার প্রতিবন্ধক