ইলমের প্রয়োজনীয়তা - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ইলমের প্রয়োজনীয়তা
(মিনহাজুল আবেদীন)
———————
ইবাদতের জন্য ইল্ম—
হযরত রসূলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন :
“প্রত্যেক মুসলমানের উপর ইলম হাসিল করা ফরয”।
এখন তোমার জানা দরকার-- কোন্ ইলম হাসিল করা ফরয এবং ইবাদতে ইলাহীতে বান্দার জন্য কোন ইমের প্রয়োজন। মোটামুটি একটি কথা মনে রাখ, যেসব বিষয় হাসিল করা ফরয এবং জরুরী তা তিন প্রকার। যথা-- তওহীদ সম্পর্কিত ইলম, অন্তঃকরণ ও অন্তঃকরণের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কিত গোপন ইলম এবং শরীয়ত সম্পর্কিত ইলম।
এ তিন প্রকারের ইলমের আবার প্রত্যেকটারই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ হাসিল করা ফরয ও জরুরী।
(১) ইলমে তওহীদ
ইলমে তওহীদের ততটুকুই হাসিল করা ফরয, যার দ্বারা তোমার দীনের মূলনীতি জানা হয়। দীনের মূলনীতি হলো : তোমার একজন প্রকৃত মা'বুদ আছেন, যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন; তিনি চিরঞ্জীব এবং এক, অদ্বিতীয়; তাঁর কোন শরীক নেই, সকল পরিপূর্ণ গুণে তিনিই গুণান্বিত এবং সকল প্রকার কমতি-দুর্বলতা বা ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত তিনিই। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও প্রেরিত রসূল, তিনি আল্লাহ্ তা'আলার আহকামসমূহের বর্ণনা এবং আখিরাতের ঘটনাবলী সম্পর্কে যে তথ্য প্রদান করেছেন তা সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য। তিনি সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত।
(২) ইলমে মারেফত (গোপন ইলম)
অতঃপর তোমার জানা দরকার নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম)-উনার সুন্নতের কিছু মূলনীতি। এটা জানা শুধু দরকারই নয়-- অপরিহার্যও। আর কালামুল্লাহ্ ও সুন্নতে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে কোন কিছু যতক্ষণ পাওয়া যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যাপারে নিজের রায় ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে। তা না হলে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে বিপজ্জনক অবস্থা সৃষ্টির আশংকায় পতিত হবে। তাছাড়া তওহীদের সমস্ত মূল বিষয় আল্লাহ্র কিতাবেই মজুদ রয়েছে। তদুপরি আমাদের পূর্ববর্তী জ্ঞানিগণ দীনের মূলনীতি সম্পর্কে যেসব গ্রন্থ রচনা করে গেছেন, তাতে ও এসব বিষয়ের প্রয়োজনীয় বিবরণ রয়েছে।
সারকথা, তুমি বিশেষভাবে মনে রাখবে যে, যে বিষয়েই তুমি নিজের অজ্ঞতার কারণে ধ্বংস থেকে নিরাপদ নও, তার ইলম হাসিল করা ফরয ও জরুরী — এটা পরিত্যাগ করা কোন অবস্থাতেই সমীচীন নয়।
গোপন ইলমের মধ্যে জরুরী হচ্ছে তার ওয়াজিবসমূহ, তার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ সম্পর্কে পরিচয় লাভ করা। তা হলেই তুমি লাভ করবে এমন জিনিস যা আল্লাহর মহত্ত্ব অনুধাবনের বোধ, ইখলাস ও বিনীত ভাবসহ তোমার অন্যান্য নেক আমলকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে সক্ষম হবে। ইনশাআল্লাহ, সকল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা সামনের অধ্যায়গুলোতে করা হবে ।
(৩) ইলমে শরীয়ত
এখন অবশিষ্ট রইল ইলমে শরীয়ত। ইলমে শরীয়তের মধ্যে শিক্ষা লাভের জন্য জরুরী হলো : তোমার উপর যেসব কাজ ফরয তা তুমি যাতে সুষ্ঠুভাবে আদায় করতে পার, তজ্জন্য সে সব বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান লাভ করা। যেমন-
পবিত্রতা, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ। এসব কাজ যদি তোমার উপর ফরয হয়ে থাকে, তবে এসবের আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান হাসিল করাও তোমার জন্য ওয়াজিব; নতুবা এ সম্পর্কে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলম হাসিল করা জরুরী।
মোটকথা, ইলম যে ফরয তা প্রমাণিত হয়ে গেল। সুতরাং ইলম ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।
এখন তুমি যদি জানতে চাও যে, আমার জন্য ইলমে তওহীদের ততটুকু অংশ হাসিল করা কি ফরয, যার দ্বারা আমি ইসলামের সত্যতা প্রমাণিত করে সমস্ত কাফির জাতিকে মিটিয়ে দিতে পারি এবং সকল প্রকার বিদ'আতের মূলোৎপাটন করে সুন্নতের রাস্তায় চলতে তাদের বাধ্য করতে সক্ষম হই?
মনে রেখো, ততখানি ইলম হাসিল ফরযে কিফায়া আর তোমার জন্য শুধু এতটুকু ফরয, যার দ্বারা দীনের মূলনীতিতে তুমি তোমার আকীদা রাখতে সক্ষম হও – এর অধিক কিছু নয়। তেমনি দীনের সকল শাখা-প্রশাখা এবং তার - হাকীকত হাসিল করা এবং সকল মাস'আলার উপর দখল রাখা ফরয নয়। হ্যাঁ, যদি দীনের মূলনীতির মধ্যে কোনটায় তোমার সন্দেহ এসে যায়, যার ফলে তোমার আকীদায় সন্দেহ সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে, তাহলে ততটুকু তথ্য তোমার তখন জানা ফরয হবে, যার দ্বারা তোমার সে সন্দেহ দূর হয়ে যায়। তবে এসব ব্যাপারে বিতর্ক ও পরস্পর ঝগড়া-ফ্যাসাদ অবশ্যই পরিত্যাগ হওয়া উচিত। কেননা এ বিতর্ক একটা রোগ। এতে কোন ফায়দা নেই। নিজের উদ্যমকে এ থেকে দূরে রাখা দরকার। কারণ এতে যে একবার লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার জন্য নাজাত ও সাফল্য লাভ খুবই মুশকিলের ব্যাপার-- যদি না আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অশেষ করুণা ও রহমত দিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।
তাছাড়া আহলে সুন্নতের দাবিদারগণের ব্যাখ্যা দ্বারাই যখন, সন্দেহ দূর হয়ে যেতে পারে, বিদ'আতীদের কথার জবাব পাওয়া যায়, ইলম শক্তিশালী হয় এবং আহলে হকদের অন্তর থেকে বিদ'আতীদের ধোকা দূরীভূত হয়, তখন এ জন্য অন্যদের পক্ষে তওহীদ সম্পর্কে অতিরিক্ত জ্ঞানার্জন আর ফরয থাকে না। তেমনিভাবে সমস্ত ইলমের গূঢ় তত্ত্ব ও কলবের আশ্চর্যজনক সব কথা সম্পর্কে ই জ্ঞান হাসিল জরুরী নয়। কিন্তু তা না জানা থাকায় তোমার ইবাদতে যদি শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তবে ফাসাদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তখন তোমার সে সব জানা জরুরী। আর তাছাড়া ইবাদতে ইলাহী যাতে সুষ্ঠুভাবে আদায় করা যায়, তজ্জন্য ইবাদত ও ইবাদত সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হুকুম-আহকাম সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান হাসিল অবশ্যই জরুরী। যেমন- হামদ ও শোকর এবং তাওয়াক্কুল। এছাড়া, অন্য কিছু সম্পর্কে জ্ঞান হাসিল জরুরী নয়।
এখন আমাদের জানা দরকার, ইলমে তওহীদের উপরিউক্ত পরিমাণ শিক্ষা কি ওস্তাদ বা শিক্ষক ছাড়াই সম্ভব? ওস্তাদ সাহায্য ও সহযোগিতাকারী হিসেবে কঠিন জায়গায় সহজ করে বুঝিয়ে দিয়ে থাকেন। ফলে ওস্তাদের সাহায্যে ইলম হাসিল সহজ ও উত্তম হয়। অবশিষ্ট, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান, তার উপর ইলমের বারি বর্ষণ করেন। আসলে আল্লাহ্ই প্রকৃত শিক্ষক।
মনে রাখতে হবে, ইলমের ঘাঁটি অত্যন্ত সংকুল। এর দ্বারাই অভীষ্ট সিদ্ধ হয়। এর উপকারের শেষ নেই। সেজন্য এ সংকুল ঘাঁটির অতিক্রমণও তেমনি কঠিন ও কষ্টসাধ্য।
এজন্যই দেখা যায়, বহু ব্যক্তি ইলমের কঠিন কাজ থেকে দূরে সরে গেছে। ফলে তারা হয়ে গেছে মূর্খ, অজ্ঞ। আবার অনেকেই এ পথ অতিক্রমের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সাফল্য লাভ করতে পারেননি- পা পিছলে পড়ে গেছেন। - অধিকাংশ ইলম হাসিলকারীই এতে অত্যন্ত পেরেশান ও ভয়ে এগিয়েছেন - আবার এমনও ব্যক্তি আছেন, যাঁরা অতি অল্প সময়ে এ ঘাঁটি পার হয়ে গেছেন। অপরপক্ষে, এমন অনেক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা হয়তো জীবনের দীর্ঘ সত্তর বছর এ সংকুল ঘাঁটির মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছেন। মনে রাখতে হবে, সকল ব্যাপারই সাফল্য লাভের চাবিকাঠি সেইটা পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা'আলার হাতে।
ইলমের উপকারিতা এতক্ষণ বর্ণনা করা হলো। তাতে প্রমাণিত হলো যে, বান্দার জন্য ইলম হাসিল কত প্রয়োজন, কত জরুরী? ইবাদত সম্পূর্ণ নির্ভর করে ইলমের উপর-- বিশেষ করে ইলমে তওহীদ ও গোপন ইলমের উপর। বর্ণিত আছে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর ওহী নাযিল করে বললেন : “ওহে দাউদ' উপকারী ইলম হাসিল কর”। হযরত দাউদ (আঃ) আরয করলেন : “হে পরওয়ারদিগার। উপকারী ইলম কোনটা”? জবাবে বলা হলোঃ
“আমার (আল্লাহর) ঐশ্বর্য, মহত্ত্ব, আমার উদারতা এবং সব বিষয়ের উপরই আমার শক্তি আছে- একথা উপলব্ধি করা। কেননা এসব বিষয়েই তোমাকে - আমার নৈকট্য লাভে সহায়তা করবে”।
হযরত আলী ইবনে আবুতালিব (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন : “আমি চাই না যে, বড় হয়ে আল্লাহর মারেফত হাসিলের আগে শৈশবেই আমি ইন্তেকাল করে জান্নাতে চলে যাই। কারণ মানুষের মধ্যে যে ব্যক্তি সবচাইতে বেশি আল্লাহর মারেফত রাখে, সে-ই আল্লাহকে সবচাইতে বেশি ভয় করে, সবচাইতে অধিক ইবাদত করে এবং সে ব্যক্তিই আল্লাহর রাস্তায় সবচাইতে বেশি চলতে সক্ষম”।
ইলমের কঠিন দিক হলো এই যে, শুধুমাত্র রেওয়ায়েত হাসিলেই তা যেন সীমাবদ্ধ না থাকে এবং বুদ্ধি ও মারেফতের অনুসন্ধান স্পৃহার উৎকর্ষ দানে সক্ষম হয়। তজ্জন্য ইলমের অনুসন্ধানে নিজের নফস ইখলাসের শক্তি সৃষ্টিতে নিয়োজিত হয়। তাছাড়া ইলম হাসিলে আরও বহু বিপদাশঙ্কা থাকে। কেউ যদি নিজের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও আমীর এবং বিত্তশালীদের মধ্যে স্থান করে নেয়া এবং মানুষের সাথে অহংকার প্রদর্শন ও দুনিয়ার অন্যান্য স্বার্থের জন্য ইলম হাসিল করে, তবে তার এ ব্যবসায়ে কোন লাভ হবে না। তার সকল প্ৰচেষ্টা কেবল ক্ষতিই বহন করে আনবে। হযরত রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন :
“যে ব্যক্তি এ জন্য ইলম হাসিল করে যে, তার দ্বারা আলিমদের সাথে দ্বন্দ্ব প্রকাশ করবে বা তার দ্বারা বেকুফদের সাথে ঝগড়া করবে কিংবা মানুষকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দোযখে নিক্ষেপ করবেন”।
আবূ ইয়াযিদ বোস্তামী (রহঃ) বর্ণনা করেছেন : আমি দীর্ঘ ত্রিশ বছর মুজাহাদায় কোশেশ করেছি। এর মধ্যে ইলমের বিপদের চাইতে অধিক কোন কঠিন বিষয় পাইনি।
তাছাড়া, ইলম হাসিলের আরও একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। তা এই যে, শয়তান 'তোমার জন্য সৌন্দর্য পরিপূর্ণ জিনিস যোগাড় করে এনে তোমাকে এলোমেলোতে ফেলে দেবে। সুতরাং যখন ইলমে এসব বিপদ দেখা দেবে। তখনই তা পরিত্যাগ করবে। তাহলে এগুলো তোমাকে আর ধোঁকায় নিপতিত করতে পারবে না। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : “শবে মি'রাজে দোযখের ধারে গিয়ে দেখতে পেলাম, অধিকাংশ দোযখীই ফকীর। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো : আয় আল্লাহর রসূল! তারা কি অর্থের দিক থেকে ফকীর? তিনি জওয়াব দিলেন : না, ইলমের দিক থেকে ফকীর”। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করবে না, তার পক্ষে ইবাদতের আহকাম পালন করতে যাওয়া মোটেই শোভা পায় না। সে কিছুতেই সুষ্ঠুভাবে ইবাদতের হক আদায় করতে সক্ষম হবে না। সুতরাং যে ব্যক্তি আসমানের ফেরেশতার ন্যায় বিনা ইলমেই আল্লাহর ইবাদত শুরু করবে, তাকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যেই পরিগণিত করা হবে।
ইলম হাসিলের জন্য অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে একাগ্রতা ও উদ্যমের সাথে চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে আলস্য ও নৈরাশ্য সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। নতুবা (আল্লাহ না করুন) তোমার জন্য মূর্খতার সীমা অতিক্রম করাই সম্ভব হবে না। স্পষ্ট কথা এই যে, যখন তুমি সৃষ্টিকর্তার নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা শুরু করবে, তখন তুমি পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারবে যে, তোমার, আমার-- সকলের জন্যই একজন প্রকৃত স্রষ্টা আছেন, যিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। তিনি চিন্ময়, দ্রষ্টা ও সব কিছুই শুনতে পান, তিনি সকল প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে। তাঁর গুণাবলীর বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মখলুকের কোন জিনিসের সাথে তাঁর তুলনা হতে পারে না কিংবা তাঁর দ্বারাও মখলুকের জিনিসের তুলনা করা যায় না। তিনি অভাবহীন, কোন কিছুরই তাঁর প্রয়োজন নেই। যে কোন প্রকারের পংকিলতা ও প্রতিবন্ধকতা তাঁর সংশ্লিষ্ট হতেই পারে না।
তেমনি যখন তুমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম)-উনার মু'জিযা, নির্দশন ও নবুয়তের আলামতসমূহ সম্পর্কে চিন্তা করবে, তখন পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবে যে, তিনি সত্যিই আল্লাহর রসূল। ওহীর বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি সত্যবাদী ও আমীন এবং যেসব বিষয়ে সলফে সালেহীন আকীদামন্দ, তার সবই সত্য। তা এই যে, আখিরাতে মুসলমানগণ আল্লাহ্ রাব্বুল ইয়্যতের দীদার লাভ করবেন, আল্লাহ্ বিদ্যমান এবং তিনি কোন কিছুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। আল-কুরআন আল্লাহ্ কালাম এবং তা মখলুক নয়।
আর যেহেতু আল্লাহর রাজ্য ও তাঁর শাসন বিধানে কোন ধোঁকাবাজের ধোঁকা এবং কোন বাধাদানকারীর বাধা কোন কাজেই আসে না, কেবল আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ও কুদরতেই সবকিছু পরিচালিত হয়, তাঁর নিকট থেকেই ভাল-মন্দ, লাভ-ক্ষতি, ঈমান-কুফর সব কিছুর আগমন হয় এবং আল্লাহর মখলূকে তিনি ব্যতীত কারো কিছু করার সাধ্য নেই। সুতরাং তিনি যাকে চান, সওয়াব ও অনুগ্রহ এবং রহমত দান করেন, যাকে চান, শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত করেন। এটাও সাধিত হয় তারই ন্যায় বিচারানুযায়ী আর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম)-উনার পবিত্র জবানে আখিরাতের বিষয় সম্পর্কে যেসব আহকাম প্রকাশ পেয়েছে তার সবই সত্য। সুতরাং সেগুলোকে অটুট বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করতে হবে। যেমন হাশর-নশর, কবরের আযাব, মুনকির-নকীরের সওয়াল-জওয়াব, আমলের জন্য মীযান এবং পুলসিরাত। সলফে সালেহীন এসব বিষয়ে পূর্ণ আকীদামন্দ ছিলেন এবং তাঁরা এগুলোকে দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাসের জন্য উৎসাহিতও করে গেছেন। তাছাড়া, এসব মূল বিষয় সম্পর্কে কোন প্রকার 'বিদ'আত' প্রকাশ পাওয়ার আগেই এগুলোর উপর 'ইজমা'ও (যুগের উলামাদের সর্বসম্মত রায়) হয়ে গেছে। সুতরাং আমরা আল্লাহর দরবারে এই মুনাজাত করছি, তিনি যেন দীনের ব্যাপারে কোন 'বিদ'আত' উদ্ভাবন ও নিজের আকাঙ্ক্ষার অনুসরণ করার ন্যায় কাজ থেকে আমাদের মুক্ত রাখেন।
এরপর তুমি আমলে কলব' এবং নিষিদ্ধ বিষয় সম্পর্কে চিন্তা করবে এবং যেসব বিষয়ে এ ব্যাপারে অতি জরুরী তা হাসিল করবে যথা পবিত্রতা, নামায, রোযা ইত্যাদি । অতঃপর তুমি তোমার উপর যা কিছু দায়িত্ব আরোপিত আছে, তা আদায় করবে। মনে রাখবে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম)-উনার উম্মতের দৃঢ় বিশ্বাসী উলামাগণ এভাবেই এ পথে আমল করে আসছেন। সুতরাং তুমি ইল্ম মুতাবিক আমল কর এবং আখিরাতের ভিত্তি নির্মাণের প্রতি মনোযোগী হও, তাহলে তুমি আল্লাহ তা'আলার আহকাম সম্পর্কে পূর্ণ দূরদৃষ্টিসহ একজন আলিম বান্দা হিসেবে 'আমলকারীদের মধ্যে পরিগণিত হতে সক্ষম হবে – অন্ধ অনুসরণ ও নিষ্প্রাণ - আমলের সাথে তোমার কোনই সম্পর্ক থাকবে না । এমতাবস্থায় তোমার জন্য মহান মর্যাদা তোমার ইলমের মহামূল্য এবং তোমার ইবাদতের জন্য অশেষ সওয়াব নির্ধারিত হবে অর্থাৎ এখন তুমি সকল সংকট অতিক্রম করে ফেলেছ এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত তৌফিকের দৌলতে তোমার উদ্দেশ্য পুরোপুরি হাসিল করেছ।
পরিশেষে, আল্লাহ্র নিকট মুনাজাত করছি, তিনি যেন আমাদের তাঁর নেক তৌফিক দান করেন। কেননা তিনিই তো পরম করুণাময়'
(সমাপ্ত)
—————-
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment