আশ্-শিফা (পর্ব– ১) প্রথম পরিচ্ছেদ- হুজুর (সঃ)-উনার প্রসংশা
প্রথম পরিচ্ছেদ- ( হুজুর (সঃ)-উনার প্রসংশা )
কুরআনের আয়াত দ্বারা আল্লাহ তা'আলার হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া সাল্লাম) উনার প্রশংসা —
মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া সাল্লাম) উনার প্রশংসা করে এরশাদ করেন-
>”নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকে ঐ রাসূল তাশরীফ এনেছেন যা তোমাদেরকে বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মু'মিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু”।
আল্লামা সমরকন্দি (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, কোনো কোনো লোক '(আনফুসিকুম) এর স্থলে (আনফাসিকুম) অর্থাৎ “ফা” বে জবর যোগে পড়ে। তবে অধিকাংশ মুসলমান পেশ যোগে পড়ে।
ইমাম কাযী আবুল ফযল (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)! আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সৌভাগ্যবান করুন। তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা বিশ্বের সকল মুসলমান, চাই সে আরবী হোক বা মক্কাবাসী হোক বা দুনিয়ার যেকোন স্থানের অধিবাসীই হোক না কেন, (তাফসীরকারকদের মতভেদ থাকা সত্ত্বেও) এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট এমন একজন রাসূলের আগমন ঘটেছে যাঁকে তোমরা খুব ভালোভাবে চিনো। তাঁর মর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে তোমরা ভালোভাবে অভিহিত। আর সেই মহিমান্বিত রাসূল (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে তোমরা কোনো দিন মিথ্যাবাদী কিংবা অহিতাকাঙ্খী হিসেবে অভিযুক্ত করতে পারনি অথচ তিনি তোমাদের মাঝে ছিলেন। আর না তাঁর বংশের সাথে তোমাদের দূরের ও কাছের আত্মীয়তার বন্ধন ছিলো, এমনও তো নয়।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা) ও অপর একদল তাফসীরবিশারদগণের মতে পবিত্র কুরআন মাজীদের আয়াত-
>”কিন্তু নিকটাত্মীয়ের ভালবাসা”।
(
আল কুরআন: সূরা শুরা, ৪২:২৩।)
এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটাই যে, তিনি তাদের সকলের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত, সুউচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন অর্থাৎ 'আনফাসিকুম শব্দে যদি জবরের সাথে পড়া হয় তাহলে অর্থ দাঁড়াবে “তিনি তোমাদের মধ্যে বিশেষ এবং শ্রেষ্ঠতম”। অতঃপর আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশংসনীয় গুণাবলির উল্লেখ করে অসংখ্য মর্যাদার বিবরণ পেশ করেছেন।
তাঁর তীব্র বাসনা এবং আত্মপ্রত্যয় ছিলো মানুষ সঠিক পথে আসুক, হিদায়াত গ্রহণ করুক। আর মুসলমানদের কষ্টে পতিত হওয়া তাঁর নিকট বড়ই মর্মবিদারক পীড়াদায়ক ব্যাপার। দুনিয়া ও আখিরাতে তোমরাও ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদাপন্ন হবে এটা ছিলো তাঁর নিকট অসহনীয়। এর হাকীকত হলো- তিনি মুসলমানদের প্রতি পরিপূর্ণ দয়ার্দ্র, স্নেহশীল ও মায়ামমতা পোষণকারী। কোনো কোনো আলেমদের অভিমত হলো- আল্লাহ তা'আলা তাঁর আপন নাম সমূহের মধ্য থেকে তাঁকে 'রাউফ' ও 'রাহীম' নামদ্বয় প্রদান করেছেন।
অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে-
>”নিশ্চয়ই আল্লাহ মহান অনুগ্রহ করেছেন মুসলমানদের উপর যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তার আয়াতসমূহ তাদের নিকট তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব হিকমত শিক্ষা দেন, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল”।
(
আল কুরআন: সূরা আলে ইমরান ৩:১৬৪ ও ১৩৪)
অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে—
>”তিনিই উম্মী লোকদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যে তাদের নিকট আবৃত্তি করেন তাঁর আয়াতসমূহ; তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত; ইতিপূর্বে তো তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।
(
আল কুরআন সূরা যুম' আহ্ ৬২:২)
অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে-
>যেমন “আমি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করেছি, যে আমার আয়াতসমূহ তোমাদের নিকট তিলাওয়াত করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয় আর তোমরা যা জানতে না তা শিক্ষা দেয়।
(
আল কুরআন সূরা বাকারা, ২:১৫১।)
উক্ত আয়াতসমূহে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার প্রশংসা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার বাণী— ‘(মিন আনফুসিকুম)' এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত আছে। হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন—
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মধ্যে বংশে ও শশুরের বংশে উৎস 'হযরত আদম (আলাইহিস্ সালাম) থেকে আমার পিতা, পিতামহ কেউ ব্যভিচারী ছিলো না। তাঁরা সবাই বিবাহিত ছিলেন।
হযরত ইবনে কালবী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, “আমি হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার উর্ধ্বতন দাদী- নানীদের পাঁচশ জনের নাম সংগ্রহ করেছি। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একজনও ব্যভিচারী পাইনি। আর তাঁদের কাউকে জাহেলি যুগের অজ্ঞতা ও কাউকে স্পর্শ করতে পারেনি”।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা) থেকে আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণিত আছে যে,–
>”আর আমি আপনাকে নামাযীদের মধ্যে স্থানান্তরিত করেছি”।
(
আল কুরআন: সূরা শু'আরা ২৬:২১৯)
এ আয়াতের অর্থ হলো–
“আপনার মহন সত্তা এক নবী থেকে অপর নবীর মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। অতঃপর আমি আপনাকে নবী হিসেবে প্রকাশ করেছি”।
হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বর্ণনা করেছেন; আল্লাহ তা'আলা জানতেন যে, কোনো সৃষ্টিজীবই তাঁর ইবাদতের হক আদায় করতে পারবে না। তাই আল্লাহ তা'আলা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য চাইলেন মাখলুকের নিকট স্বীয় পরিচয় প্রদান করতে যাতে তারা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে উচ্চমর্যাদা লাভ করতে পারে। তাতেও তিনি দেখলেন তারা অক্ষম। তাই তিনি এক মাখলুক সৃষ্টি করেন। যিনি তাদেরই স্বশ্রেণীভুক্ত। তাঁকে সৃষ্টি করে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গুণাবলী থেকে রহমত ও মেহেরবানীর পোশাকে আচ্ছাদিত করে মাখলুকের নিকট স্বীয় দূত হিসেবে প্রেরন করেণ।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাগণের পক্ষ থেকে রাসূলের আনুগত্য করাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর (আল্লাহর) আনুগত্য এবং রসূলের আনুকূল্য স্বয়ং তাঁর (আল্লাহর) আনুকূল্য হিসেবে কবুল করেন।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছে-
>”যে ব্যক্তি রাসূলের নির্দেশ মান্য করেছে নিঃসন্দেহে সে আল্লাহরই আনুগত্য করেছে”।
(
আল কুরআন: সূরা নিসা, ৪:৮০)
অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে-
>”আর আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি বিশ্বজগতসমুহের জন্য রহমত করেই”।
(
আল কুরআন: সূরা আম্বিয়া, ২১:১০৭)
হযরত আবু বকর মুহাম্মদ বিন তাহের (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, আল্লাহ তা'আলা হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি এয়াআলিহিওয়াসাল্লাম) উনাকে রহমতের সৌন্দর্যে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। উনাকে রহমতের এমন মূর্তপ্রতীক করেছেন যে, যার সকল শামায়েল ও সিফাতসমূহ মাখলুকের জন্যই শুধু রহমত। সুতরাং তাঁর মুবারক অস্তিত্ব বিশ্বজগত সমুহের জন্য রহমত হয়ে যায়। সেহেতু সে রহমতের অংশ যাঁর ভাগেই পড়েছে সেই দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে নাজাত পেলো এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে যা তার পছন্দনীয় তাই সে পাবে। তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না মহান আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে এরশাদ করেছেন-
>”আর আমি আপনাকে বিশ্বজগতসমুহের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি”।
(
আল কুরআন: সূরা আম্বিয়া, ২১:১০৭)
সুতরাং হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র হায়াতও রহমত ওফাতও রহমত। যথা হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন,–
“আমার জীবন এবং ওফাত উভয়টিই তোমাদের জন্য রহমত”।
হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন,
“আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো উম্মাতের উপর রহমত নাজিল করার ইচ্ছা করেন তখন তাদের নবী উঠিয়ে নিতেন। তিনি তাদের পূর্বে আল্লাহ তাআলার দরবারে পৌঁছে তাদের মাগফিরাত কামনা করতেন।
‘রহমাতাল লিল আলামীন'এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হযরত আল্লামা ফকীহ আবু লাইস সমরকন্দী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, এটা তার অর্থাৎ হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সমগ্র মানব ও জীনজাতির জন্য রহমত। অপর একদল ওলামাদের অভিমত হলো- হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সমগ্র সৃষ্টি জীবের জন্য রহমত।
হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মুমিনদের জন্য রহমত হিদায়াতের মাধ্যমে, মুনাফিকদের জন্য রহমত তাঁর উপস্থিতিতে হত্যা করা থেকে নিরাপত্তা প্রাপ্তির মাধ্যমে। আর কাফিরদের জন্য রহমত আল্লাহ তা'আলার আযাব-গজব বিলম্বিত হওয়ার মাধ্যমে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা) বলেন, হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মুমিনদের জন্য যেমনি রহমতস্বরূপ, তেমনি কাফিরদের জন্যও রহমত। কেননা তাঁর উপস্থিতিতে কাফিররা ওই সমস্ত আযাব থেকে নাজতি পেয়েছে যা পূর্ববর্তী উম্মাতরা তাদের নবীগণকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করার কারণে যে শাস্তি পেতো।
এক বর্ণনায় এসেছে একবার হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস্ সালাম)-কে জিজ্ঞেস করেন- বলুনতো আমার রহমত আপনি কিভাবে লাভ করেছেন? তদুত্তরে হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস্ সালাম) বললেন, হ্যাঁ প্রথমে আমি আমার শেষ পরিণতি সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। কিন্তু যখন পবিত্র কুরআন মাজীদে এইভাবে আমার প্রশংসা করা হয়েছে-
“তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী, আরশাধিপতির দরবারে সম্মানিত। সেখানে তাঁর আদেশ পালন করা হয়, যিনি আমানতদার”।
(
আল কুরআন: সূরা তাকভীর, ৮১:২০-২১)
এখন আমি আমার শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। আপনার উসিলাতেই আমি নিরাপত্তা লাভ করেছি। এভাবেই আমি আপনার রহমতের অংশ লাভ করেছি।
হযরত জাফর সাদেক (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) পবিত্র কুরআন মাজীদের আয়াত-
“তবে হে মাহবুব! আপনার উপর সালাম হোক, ডানপার্শ্বস্থদের পক্ষ থেকে”
(
আল কুরআন সূরা ওয়াক্বিয়াহ, ৫৬:৯১)
এর তাফসীর প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন- “হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার উসিলাতে নেককারগণ নিরাপত্তা প্রাপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ নেককার লোকেরা নিরাপত্তার যে দৌলত লাভ করেছে তা একমাত্র হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার কারণেই লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।
অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে–
“আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনের আলো, তার আলোর উপমা এমনই যেমন একটা দীপাধার, যার মধ্যে রয়েছে প্রদীপ, ঐ প্রদীপ একটা ঐ ফানুসের মধ্যে স্থাপিত। ঐ ফানুস যেন একটি নক্ষত্র, মুক্তার মত উজ্জ্বল হয় বরকতময় বৃক্ষ যয়তুন দ্বারা, যা না প্রাচ্যের, প্রতীচ্যের; এর নিকটবর্তী যে, সেটার তৈল প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠবে যদিও আগুন সেটাকে স্পর্শ না করে। আলোর উপর আলো। আল্লাহ আপন আলের প্রতি পথ নির্দেশনা দান করেন যাকে ইচ্ছা, এবং আপন উপমাসমূহ বর্ণনা করেন মানুষের জন্য। এবং আল্লাহ সবকিছুই জানেন”।
হযরত কা'ব আহবার ও হযরত সাঈদ বিন জোবায়ের (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন,-“এখানে নূর অর্থ হলো হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)।
আর আল্লাহ তা'আলার বাণী— তাঁর নূরের উদাহরণ" এর অর্থও হলো হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার নূর মুবারক।
হযরত সাহল বিন আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, এ আয়াতের অর্থ হলো- আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও যমীনের অধিবাসীদের হিদায়াতদানকারী। অতঃপর বলেন, হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নূরের উদাহরণ হলো যখন তিনি পবিত্র পিষ্ঠসমূহে বিদ্যমান ছিলেন তা 'দীপাধারে'র মতো। তাঁর এই প্রশংসিত গুণাবলি এমনই। প্রদীপ এর অর্থ হলো- হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র হৃদয়। আর হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র বক্ষ হচ্ছে ফানুস সদৃশ, যাতে ঈমান ও হেকমতের উজ্জ্বল জ্যোতি ঝলমল করছে। আর ঐ চেরাগ যা এক মুবারক গাছের তৈল দ্বারা প্রজ্বলিত করা হয়। আর সেই মুবারক গাছের অর্থ হলো হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস্সালাম) এর নূর। এখানে তাঁকে উপমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর আল্লাহ তা'আলার বাণী-
“এর নিকটবর্তী যে, সেটার তৈল প্রজ্বলিত হয়ে উঠবে”। অর্থাৎ অচিরেই হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নবুওয়াত প্রকাশিত হবে। যেন তা যয়তুনের তেল। এই আয়াতের আরও অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা এ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।
এছাড়াও অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে 'সিরাজুম মুনিরা’
আলো ও আলোক প্রদানকারী প্রদীপ' উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
এজন্য অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে–
“নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা নূর এসেছে এবং স্পষ্ট কিতাব”।
অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে—
“নিশ্চয় আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি উপস্থিত পর্যবেক্ষণকারী করে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে, এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর নির্দেশে আহবানকারী আর আলোকোজ্জ্বলকারী সূর্যরূপে।
এপ্রসঙ্গে অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে—
“আমি কি আপনার বক্ষ প্রশস্থ করিনি? আর আমি আপনার বোঝা অপসারণ করেছি, যা আপনার জন্য অতিশয় কষ্টদায়ক ছিল, এবং আমি আপনার জন্য আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি। সুতরাং নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্থি রয়েছে। নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্থি রয়েছে। অতএব, আপনি যখন নামায থেকে অবসর হবেন তখন একান্তে দোয়া প্রার্থনা করুন এবং আপন প্রতিপালকের প্রতি মনোনিবেশ করুন”।
এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, 'শরহ' অর্থ প্রশস্থ করা। আর 'সদর' অর্থ হৃদয়। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মুবারক বক্ষকে ইসলামের জ্যোতি দ্বারা উজ্জ্বল করেছেন।
হযরত সাহল (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, রিসালতের নূর দ্বারা প্রশস্ত করেছেন। হযরত হাসান (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরিপূর্ণ করার মাধ্যমে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মুবারক বক্ষকে সম্প্রসারিত করেছেন।
অপর একদল তাফসীরবিদের মতে, এর অর্থ হলো- আমি কি আপনার বক্ষকে পবিত্র করিনি, যে শয়তান কুমন্ত্রণা দিতে না-পারে-
আর আপনার উপর থেকে আপনার সেই বোঝা নামিয়ে নিয়েছি, যা আপনার পৃষ্ঠ ভেঙ্গেছিলো।
একদল ওলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- বোঝার অর্থ হলো নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বে সংগঠিত ভুলত্রুটিসমূহ।
অপর একদল ওলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- জাহিলিয়াতের অন্ধকার যুগের বোঝা, অর্থাৎ জাহিলিয়াতের অন্ধকার যুগের লোকদের নৈতিক অধঃপতন দেখা তাঁর জন্য তা ভীষণ কষ্টদায়ক ছিল।
অপর একদল ওলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- নবুওয়াত লাভের পর উম্মতের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর যে গুরুদায়িত্বের ভার তাঁর উপর অর্পিত হয়েছিলো।
আল্লামা মাওয়ার্দী ও সুলামী (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)ও এ অভিমতের সমর্থক ।
ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দি (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) ও অপর একদল ওলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- “আমি আপনাকে শুনাহের বোঝা থেকে মুক্ত করেছি। যদি আপনাকে মাসূম বা নিষ্পাপ করা না হয়। তাহলে নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বের ভুলত্রুটির কারণে আপনার কোমর মুবারক ভেঙ্গে যাবে।
“আর আমি আপনার আলোচনাকে সমুন্নত করে দিয়েছি”।
হযরত ইয়ায়া বিন আদম (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, আল্লাহ তা'আলা নবুওয়াত প্রদানের মাধ্যমে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আলোচনাকে সমুন্নত করে দেন।
অপর একদল ওলামায়ে কেরামগণের অভিমত হলো, যখন আমার জিকির করা হবে তখন আপনার জিকিরও করা হবে। এই কারণে কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” এর সাথে “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”- উচ্চারণ করা হয়। সুতরাং যখন আল্লাহ তা'আলার নাম স্মরণ করা হবে, তখন হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নামও স্মরণ করা হবে।
অপর একদল ওলামায়ে কেরামগণের অভিমত হলো যে, এখানে আযান ও ইকামতে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নাম উচ্চারিত হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কাযী আবুল ফযল আয়ায (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, উক্ত আয়াতের দ্বারা একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কতো মহিমান্বিত, সুউচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর অপূর্ব নিয়ামতরাজি দ্বারা কিভাবে তাঁকে সুশোভিত করেছেন। তাঁর মুবারক কালবকে ঈমান ও হিদায়তের মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তাঁর বক্ষ মুবারক এতো অধিক পরিসরে প্রশস্থ ও উন্মুক্ত করা হয়েছে যাতে তা অগণিত অসংখ্য সীমাহীন ইলম ও হিদায়াত ধারণ করার মর্যাদা লাভ করেছে। আর আল্লাহ তা'আলা অন্ধকার যুগের সত্য বিমূখতার স্বভাব থেকে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে দেন। যার ফলে তাঁর দীন অন্যান্য দীনের উপর পুরোপুরিভাবে বিজয়ী হতে পারে। তারপর নবুওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব অর্পিত হবার পর তাঁর উপর যে গুরুদায়িত্বের বোঝা ন্যস্ত করা হয়েছে সেই বোঝাকেও আল্লাহ তা'আলা দ্বীন পৌঁছানোর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে মুক্ত করে দেন। আল্লাহ তা'আলা এটাকেও যথেষ্ট মনে করেননি তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁর মর্যাদা, সম্মান ও আলোচনাকে আরও সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র নামখানাকে তাঁর স্বীয় মহান নামের সাথে যুক্ত করে দেন।
হযরত কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত আছে- “আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আলোচনাকে সমুন্নত করেছেন। তাই ইসলামের কালেমা, আযান, নামায ও খোতবাসমূহে এমন কোনো খোতবাদানকারী নেই, এমন কোন তাশাহহুদ পাঠকারী নেই এবং এমন কোনো নামায আদায়কারী নেই যে, “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” এর সাথে “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” পাঠ করে না ।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত আছে। হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন,
“একদিন হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস্ সালাম) এসে আরয করেন, আমার ও আপনার রব জিজ্ঞেস করেছেন, কোন জিনিসের সাথে আপনার মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন। আমি বললাম এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক অবহিত। তখন হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস্ সালাম) বললেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- আপনার নাম আমার নামের সাথে উচ্চারিত হবে”।
হযরত ইবনে আতা (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, আমি পরিপূর্ণ ঈমানকে নির্ভরশীল করেছি আমার নামের সাথে আপনার নাম উচ্চারণের বিধান দিয়ে। অর্থাৎ আপনার নাম বাদ দিয়ে শুধু আমার উপর ঈমান আনলে কখনো মুমিন হবে না। তিনি আরও বাড়িয়ে বলেছেন, শুধু তাই নয়, আপনার জিকিরকে আমার জিকির, অর্থাৎ যে আপনার জিকির করলো সে মূলতঃ আমারই জিকির করলো। আপনার নাম বাদ দিয়ে আমার জিকিরে কোনো লাভ হবেনা।
ইমাম জাফর সাদেক (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, যে রিসালতের সাথে আপনার জিকির করবে, সে মূলতঃ রুবুবিয়াতের সাথে আমার জিকির করলো। অর্থাৎ যে আপনাকে রাসূল রূপে স্বীকার করলো, সে প্রকারান্তে আমাকে রব বলে স্বীকার করলো।
একদল ওলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- এখানে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর শাফায়াতের মাকামের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা নিজের সাথে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর জিকির হলো যে, আনুগত্যকে হুযুরের আনুগত্যের সাথে এবং হুযুরের পবিত্র নামকে তাঁর মহান নামের সাথে মিলিত করা।
যেমন পবিত্র কুরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছে-
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য কর”।
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো”।
উক্ত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ ও রাসূল শব্দদ্বয় সংযোগবোধক অব্যয় 'ওয়াও' দ্বারা সংযুক্ত। এভাবে আল্লাহ তা'আলার নামের সাথে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র নাম ব্যতীত অন্য কারও নাম মিলানো জায়িয নেই।
হযরত হুযায়ফা (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন যে, “তোমরা কেউ কখনো এরূপ কথা বলবে না যে, আল্লাহ তা'আলা ও অমুক ব্যক্তি যা চান বরং এরূপ বলবে যে, আল্লাহ তা'আলা যেরূপ চান অতঃপর অমুক ব্যক্তি সেরূপ চায়”।
ইমাম খাত্তাবী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, এই হাদীসে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ আদব শিক্ষা দিয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও এরাদাকে সর্বদা গায়রুল্লাহর কামনা বাসনার উপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ কারণে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরবী শব্দ 'সুম্মা' ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ প্রথমে আল্লাহ তা'আলার কথা ইরশাদ করেন, তারপর অপর ব্যক্তি ইচ্ছা করে। ‘ওয়াও' কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাতে এ বিষয়ে সন্দেহের সূচনা দেয়া দেয় যে, ইরাদা করার সাথে আল্লাহ তা'আলা ও গায়রুল্লাহ উভয়ই ইচ্ছা করে। (এটা বেয়াদবী)। একারণে ইচ্ছার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে না। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা কার্যকরী হয়, তাঁর ইচ্ছার সমান কারও ইচ্ছা হতে পারেনা। এর উদাহরণ এক হাদীসে বিদ্যমান।
জনৈক ভাষণদানকারী হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সামনে এভাবে ভাষণ দিচ্ছিলো- “যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলো সে হিদায়াত পেলো, আর যে তাদের উভয়ের নাফরমানী করলো”। এই কথা শুনে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন,
“তুমি জাতির অতি মন্দ ভাষণ দানকারী, তুমি আমার সামনে থেকে চলে যাও”৷
হযরত আবু সোলায়মান (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে এ কথা ভীষণ অপছন্দ হয় যে, ওই ভাষণদানকারী ইঙ্গিতবোধক শব্দের মাধ্যমে ওই পবিত্র নাম দুখানাকে একত্রে সমবেত করেছে। যাতে উভয় পবিত্র নাম দু'খানার মধ্যে সমতা দেখা দিয়েছে। আর একদল ওলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- সেই ভাসনদানকারী “ইয়া‘সিহিমা” শব্দের পর 'ফাকদ গাওয়া’ অর্থাৎ সে পথভ্রষ্ট হয়েছে বলেছিলো। আর ‘মাই ইয়াসিহিমা' এরপর যেভাবে লোকেরা বলে ঐ ব্যক্তি সেভাবে না বলে থেমে যায়।
তাফসীরবিদ ও শব্দতাত্ত্বিক ব্যক্তিগণ বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর ফিরিশতাগণ ঐ নবী উপর দুরূদ প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাঁর উপর দুরূদ পাঠ কর এবং উত্তমরূপে সালাম প্রেরণ কর”।
এখানে ‘ইউসাল্লুনা' শব্দে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা ও ফিরিশতাগণ উভয় দুরূদ প্রেরণ করে কিনা?
সুতরাং একদল ওলামায়ে কেরামের বলেন, উভয়ের জন্য প্রযোজ্য হবে। অপর দলের মতে, এরূপ ধারণা করা জায়িয হবে না। কেননা এ অবস্থায় ফিরিশতাবৃন্দ আল্লাহ তা'আলার সাথে একই কাজে জড়িত হয়ে যায়। (এটা জায়িয নয়) তারা বলেন ‘ইউসাল্লুনার যমীর' শুধু ফিরিশতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাদের মতে এই আয়াতের অর্থ হবে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা রহমত অবতীর্ণ করেন। আর তাঁর ফিরিশতাবৃন্দ হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর দুরূদ প্রেরণ করেন।
হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর মর্যাদাকে এভাবে প্রকাশ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আনুগত্যকে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আনুগত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। যথা পবিত্র কুরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছে- “যে ব্যক্তি রাসূলের নির্দেশ মান্য করেছে, নিঃসন্দেহে সে আল্লাহরই নির্দেশ মান্য করেছে”।
অপর এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে- “হে মাহবুব! আপনি বলে দি; হে মানবকুল যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাক, তবে আমার অনুগত হয়ে যাও। আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ভালবাসবেন”।
হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন মক্কার কাফিররা বলতে শুরু করলো মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চান যে, আমরা যেন তাঁকে দয়াময় রব বানিয়ে নিই। যেভাবে খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আলাইহিস্ সালাম) কে তাদের রব বানিয়ে ছিলো। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন- “হে মাহবুব! আপনি বলে দিন, আদেশ মান্য করো আল্লাহ ও রাসূলের আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখো যে, নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের পছন্দ করেন না।
এইভাবে আল্লাহ তা'আলা তাদের সন্তুষ্টির বিপরীতে হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আনুগত্যকে তাঁর আনুগত্যের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। আর তাফসীরবিদগণের মতে সূরা ফাতিহার এ আয়াতের অর্থেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে-
“আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করুন, তাঁদের পথে যাদের উপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন”।
যথা- হযরত আবুল আলীয়া ও হযরত হাসান বসরী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, “সিরাতুল মুসতাকীম' স্বয়ং হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পূত-পবিত্র চরিত্র ও তাঁর পরিবার-পরিজন আহলে বায়ত ও সাহাবায়ে কেরাম। এতে প্রমাণিত হয় যে, 'সিরাতুল মুস্তাকিম' হলো আহলে সুন্নাতেরই অনুসৃত পথ। যাঁরা আহলে বায়ত, সাহাবায়ে কিরাম, কুরআন ও সুন্নাহ এবং বৃহত্তম জামাআত সবাইকে মান্য করে।
হযরত আবুল হাসান মাওয়ারদী ও হযরত মক্কী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) এ অভিমতের সমর্থক। তবে হযরত মক্কী (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) আরও অতিরিক্ত বর্ণনা করে বলেন- এর অর্থ হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা)।
ইমাম আবুল লাইস সমরকন্দি (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) ও হযরত আবুল আলীয়া (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)'র সূত্রে 'সিরাতুল মুসতাকীম' সম্পর্কে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) হযরত আবুল আলীয়া (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) এর এ ব্যাখ্যা জানতে পেরে বললেন, 'আল্লাহর কসম! তিনি সত্য কথাই বলেছেন। তিনি অতি উত্তম কথাই বলেছেন।
ইমাম আবুল হাসান মাওয়ারদী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) এর ব্যাখ্যাটি হযরত আবদুর রহমান বিন জায়িদ (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন।
হযরত আবু আবদুর রহমান আস সুলামী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) একদল ওলামায়ে কেরাম থেকে আল্লাহ তা'আলার বাণী-
“সে এমন এক মজবুত গ্রান্থি ধারণ করেছে যা, কখনো খোলার নয়।
এ আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে এখানে 'মজবুত গ্রন্থির' অর্থ হুযুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম। কেউ বলেছেন, ইসলাম, আবার কেউ বলেছেন, তাওহীদের সাক্ষ্যবাণী।
আল্লাহ তা'আলার বাণী- “আর যদি আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ গণনা করো তবে সেগুলোর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবেনা”।
আর এসব অনুগ্রহ হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম এর উসীলায় প্রদত্ত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার বাণী- “আর তিনিই যিনি এ সত্য নিয়ে তাশরীফ এনেছেন এবং ঐসব লোক যারা তাঁকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। তারাই ভীতিসম্পন্ন”।
অধিকাংশ তাফসীরবিদদের অভিমত হলো- সত্য নিয়ে আগমণকারী হলেন হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)। আর একদল তাফসীরকারকের অভিমত হলো- সত্যায়নকারী হলেন হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। এক কিরআতে *সাদ্দাকা এর তাশদীদের স্থলে 'সদাকা ও পড়া যায়। অপর একদল তাফসীরবেত্তাদের মতে সত্যায়নকারী হলো সাধারণ মুমিনগণ। কারও মতে হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)। আর একদলের মতে হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)। অনুরূপ এ সম্পর্কে আরো অনেক বর্ণনা বর্ণিত আছে।
হযরত মুজাহিদ (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী- “শুনে নাও আল্লাহর স্মরণেই অন্তরে প্রশান্তি রয়েছে”
এর অর্থ হলো হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীদের স্মরণ দ্বারা অন্তরকে প্রশাস্ত করে নেয়া।
>>>>>>>>>
পরবর্তী পর্ব হুযুর (সঃ) এর সাক্ষ্যদানকারীর গুণ প্রসঙ্গে
-%E0%A6%89%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%B6%E0%A6%BE.png)
Comments
Post a Comment