তওবার মকাম (পর্ব- ২) তওবার অর্থ ও শর্তাবলী

 


 তওবার মকাম  (পর্ব-  ২)
📚মিনহাজুল আবেদীন -- ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) 

 তওবার অর্থ ও শর্তাবলী
যদি জানতে চাও যে, তওবায়ে নসুহ এর অর্থ কি এবং তার সংজ্ঞাই বা কি ? আর গুনাহ্ থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য কি করা দরকার?

তাহলে আমি বলব, তওবা হচ্ছে কলবের একটি প্রক্রিয়ার নাম। উলামায়ে কিরামের মতে, এটা হাসিল হলে মানুষ গুনাহ্ থেকে পবিত্র ও মুক্ত হয়ে যায়। আমাদের শায়খ (রহঃ) তওবার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন : আল্লাহ্ তা'আলার মহত্ত্ব জাগ্রত হওয়া এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে নিরাপদ থাকার জন্য পূর্বে গুনাহ্ বলতে যা কিছু হয়ে গেছে তাতে পুনরায় লিপ্ত না হওয়াই তওবা।

তওবার শর্ত চারটি
(১) প্রথম শর্ত : গুনাহতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা অর্থাৎ মনে মনে এ প্রতিজ্ঞা করবে যে, কিছুতেই আর এ গুনাহতে লিপ্ত হবে না। নিজের এ মতকে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কেউ গুনাহ্ হয়তো পরিত্যাগ করলো, কিন্তু মনে এমন একটা ভাব থাকলো যে, পুনরায় তাতে লিপ্ত হবে অর্থাৎ নিজের মতের উপর দৃঢ়তা নেই, বরং সন্দেহ ও আশঙ্কা বিরাজমান কিংবা এমন একটা ভাব আছে যে, পুনরায় তাতে লিপ্ত হতেও পারে, তবে তাকে বলতে হবে তিনি গুনাহ্ থেকে বিরত থাকছেন ঠিকই, কিন্তু তার তওবা হলো না। অর্থাৎ এ অবস্থায় তিনি তওবাকারী বলে পরিগণিত হবেন না ।

(২) দ্বিতীয় শর্ত : যে ধরনের গুনাহ্ পূর্বে হয়ে গেছে, তা থেকেই তওবা করবে। যে গুনাহতে কখনো লিপ্ত হয়নি, তা থেকে তওবা করলে তাকে তওবা বলা হবে না। এ ধরনের তওবাকারীকে মুত্তাকী' বলে পরিগণিত করা হবে।

যেমন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে  ‘কুফর থেকে পরহিযগার' বলা সঠিক ও জায়েয হবে, কিন্তু তাঁকে 'কুফর থেকে তওবাকারী' বলা কিছুতেই জায়েয হবে না। কারণ তাঁর থেকে কোনক্রমেই কুফরীর লেশমাত্রও প্রকাশ পায়নি। তবে হযরত উমর (রা)-কে 'কুফর থেকে তওবাকারীর' মধ্যে পরিগণিত করা যেতে পারে। কেননা তাঁর থেকে এটা প্রকাশ পেয়েছিল।

(৩) তৃতীয় শর্ত :  এখন যে গুনাহতে লিপ্ত হওয়াকে পরিত্যাগ করছে, তার সাথে তার দ্বারা আগে যা সাধিত হয়েছে, তার গুরুত্ব ও মরতবা সমান হতে হবে, আকৃতিগত সামঞ্জস্য থাকলেই চলবে না। যেমন একজন অতি বৃদ্ধ যার থেকে যিনা ও পথভ্রান্তির গুনাহ্ হয়ে গেছে, সে যদি তওবা করতে চায়, তবে তা অবশ্যই হাসিল হবে। কেননা তওবার দরজা তার জন্য বন্ধ হয়নি। তদুপরি যিনা ও পথভ্রান্তিতে লিপ্ত হওয়াকে সে 'পরিত্যাগ' করতেও সমর্থ নয়। কারণ এ সময় সে তা করতেই পারছে না। সুতরাং এ ইখতিয়ারকে পরিত্যাগের বিষয়টিও তার কর্তৃত্বে নয়। এ ক্ষেত্রে তাকে এ গুণেও গুণান্বিত করা যায় না যে, সে এ কাজ পরিত্যাগ করছে বা তা থেকে বিরত থাকছে। আদতে এসব কাজে লিপ্ত হওয়ার সামর্থ্যই তো তার নেই। এ ব্যাপারে তার ক্ষমতাই নেই। তবে সে সঙ্গে তার এমন কতগুলো কাজ করার ক্ষমতা আছে, মরতবা ও গুরুত্বের দিক থেকে যা যিনা এবং পথভ্রান্তির সমান। যেমন- মিথ্যা অপবাদ, গীবত ও চোগলখুরী। এসবও মারাত্মক গুনাহ্র কাজ। যদিও গণনার দিক দিয়ে এগুলো ভিন্ন তথাপি এসব গুনাহ্ অংশসমূহ একটি মহাপাপের স্থলাভিষিক্ত। অবশ্য তা বিদ'আতের চাইতে মরতবায় নিচে। কেননা বিদ'আত কুফর ও শিরকের নিচের পর্যায়ের গুনাহ্। যা হোক, যিনা ও পথভ্রান্তি যাবতীয় পূর্ব গুনাহ্ থেকে তওবা জায়েয হবে।(যদিও তার পক্ষে বাস্তবে সে গুনাহর নজীর পেশ করা বর্তমানে সম্ভব নয়) 

(৪) চতুর্থ শর্ত : আল্লাহর মহত্ত্ব উপলব্ধি, তাঁর অসন্তুষ্টি ও ভয়াবহ আযাব থেকে পরিত্রাণই গুনাহ্ থেকে বিরত থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া চাই । দুনিয়ার কোন লোভ, সামাজিক ভয় বা সামাজিক শাস্তির আশঙ্কা কিংবা নফসের দূর্বলতা বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য অথবা ফকিরীর কারণে করলে হবে না।

এগুলো তওবার শর্ত ও আরকান। সুতরাং এসব পরিপূর্ণভাবে প্রতিপালিত ও পূর্ণাঙ্গ হাসিল হলে তবেই বুঝতে হবে যে, প্রকৃতপক্ষে এটাই খাঁটি তওবা।


তওবার প্রারম্ভিকা

Comments

Popular posts from this blog

চরিত্র সংশোধন (১৩) আন্তরিক ব্যাধির ঔষধ ও প্রয়োগ বিধি

চরিত্র সংশোধন (১০) কুম্বভাবের প্রতিষেধক

চরিত্র সংশোধন (৮) ক্রোধ ও লোভকে আজ্ঞাবহ রাখার প্রতিবন্ধক