তওবার মকাম (পর্ব- ২) তওবার অর্থ ও শর্তাবলী
📚মিনহাজুল আবেদীন -- ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
যদি জানতে চাও যে, তওবায়ে নসুহ এর অর্থ কি এবং তার সংজ্ঞাই বা কি ? আর গুনাহ্ থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য কি করা দরকার?
তাহলে আমি বলব, তওবা হচ্ছে কলবের একটি প্রক্রিয়ার নাম। উলামায়ে কিরামের মতে, এটা হাসিল হলে মানুষ গুনাহ্ থেকে পবিত্র ও মুক্ত হয়ে যায়। আমাদের শায়খ (রহঃ) তওবার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন : আল্লাহ্ তা'আলার মহত্ত্ব জাগ্রত হওয়া এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে নিরাপদ থাকার জন্য পূর্বে গুনাহ্ বলতে যা কিছু হয়ে গেছে তাতে পুনরায় লিপ্ত না হওয়াই তওবা।
(১) প্রথম শর্ত : গুনাহতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা অর্থাৎ মনে মনে এ প্রতিজ্ঞা করবে যে, কিছুতেই আর এ গুনাহতে লিপ্ত হবে না। নিজের এ মতকে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কেউ গুনাহ্ হয়তো পরিত্যাগ করলো, কিন্তু মনে এমন একটা ভাব থাকলো যে, পুনরায় তাতে লিপ্ত হবে অর্থাৎ নিজের মতের উপর দৃঢ়তা নেই, বরং সন্দেহ ও আশঙ্কা বিরাজমান কিংবা এমন একটা ভাব আছে যে, পুনরায় তাতে লিপ্ত হতেও পারে, তবে তাকে বলতে হবে তিনি গুনাহ্ থেকে বিরত থাকছেন ঠিকই, কিন্তু তার তওবা হলো না। অর্থাৎ এ অবস্থায় তিনি তওবাকারী বলে পরিগণিত হবেন না ।
(২) দ্বিতীয় শর্ত : যে ধরনের গুনাহ্ পূর্বে হয়ে গেছে, তা থেকেই তওবা করবে। যে গুনাহতে কখনো লিপ্ত হয়নি, তা থেকে তওবা করলে তাকে তওবা বলা হবে না। এ ধরনের তওবাকারীকে মুত্তাকী' বলে পরিগণিত করা হবে।
যেমন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে ‘কুফর থেকে পরহিযগার' বলা সঠিক ও জায়েয হবে, কিন্তু তাঁকে 'কুফর থেকে তওবাকারী' বলা কিছুতেই জায়েয হবে না। কারণ তাঁর থেকে কোনক্রমেই কুফরীর লেশমাত্রও প্রকাশ পায়নি। তবে হযরত উমর (রা)-কে 'কুফর থেকে তওবাকারীর' মধ্যে পরিগণিত করা যেতে পারে। কেননা তাঁর থেকে এটা প্রকাশ পেয়েছিল।
(৩) তৃতীয় শর্ত : এখন যে গুনাহতে লিপ্ত হওয়াকে পরিত্যাগ করছে, তার সাথে তার দ্বারা আগে যা সাধিত হয়েছে, তার গুরুত্ব ও মরতবা সমান হতে হবে, আকৃতিগত সামঞ্জস্য থাকলেই চলবে না। যেমন একজন অতি বৃদ্ধ যার থেকে যিনা ও পথভ্রান্তির গুনাহ্ হয়ে গেছে, সে যদি তওবা করতে চায়, তবে তা অবশ্যই হাসিল হবে। কেননা তওবার দরজা তার জন্য বন্ধ হয়নি। তদুপরি যিনা ও পথভ্রান্তিতে লিপ্ত হওয়াকে সে 'পরিত্যাগ' করতেও সমর্থ নয়। কারণ এ সময় সে তা করতেই পারছে না। সুতরাং এ ইখতিয়ারকে পরিত্যাগের বিষয়টিও তার কর্তৃত্বে নয়। এ ক্ষেত্রে তাকে এ গুণেও গুণান্বিত করা যায় না যে, সে এ কাজ পরিত্যাগ করছে বা তা থেকে বিরত থাকছে। আদতে এসব কাজে লিপ্ত হওয়ার সামর্থ্যই তো তার নেই। এ ব্যাপারে তার ক্ষমতাই নেই। তবে সে সঙ্গে তার এমন কতগুলো কাজ করার ক্ষমতা আছে, মরতবা ও গুরুত্বের দিক থেকে যা যিনা এবং পথভ্রান্তির সমান। যেমন- মিথ্যা অপবাদ, গীবত ও চোগলখুরী। এসবও মারাত্মক গুনাহ্র কাজ। যদিও গণনার দিক দিয়ে এগুলো ভিন্ন তথাপি এসব গুনাহ্ অংশসমূহ একটি মহাপাপের স্থলাভিষিক্ত। অবশ্য তা বিদ'আতের চাইতে মরতবায় নিচে। কেননা বিদ'আত কুফর ও শিরকের নিচের পর্যায়ের গুনাহ্। যা হোক, যিনা ও পথভ্রান্তি যাবতীয় পূর্ব গুনাহ্ থেকে তওবা জায়েয হবে।(যদিও তার পক্ষে বাস্তবে সে গুনাহর নজীর পেশ করা বর্তমানে সম্ভব নয়)
(৪) চতুর্থ শর্ত : আল্লাহর মহত্ত্ব উপলব্ধি, তাঁর অসন্তুষ্টি ও ভয়াবহ আযাব থেকে পরিত্রাণই গুনাহ্ থেকে বিরত থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া চাই । দুনিয়ার কোন লোভ, সামাজিক ভয় বা সামাজিক শাস্তির আশঙ্কা কিংবা নফসের দূর্বলতা বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য অথবা ফকিরীর কারণে করলে হবে না।
এগুলো তওবার শর্ত ও আরকান। সুতরাং এসব পরিপূর্ণভাবে প্রতিপালিত ও পূর্ণাঙ্গ হাসিল হলে তবেই বুঝতে হবে যে, প্রকৃতপক্ষে এটাই খাঁটি তওবা।

Comments
Post a Comment