চরিত্র সংশোধন (২৪) চরিত্র সংশোধনের উপায়

চরিত্র সংশোধনের সাধনা ও কুস্বভাব বর্জনের উপায়- (পর্ব - ২৪)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

চরিত্র সংশোধনের উপায়-
চরিত্র সংশোধনের কার্যে অতি কঠোর সাধনা ও পরিশ্রম করিতে হয় । ইহা এত কঠিন ও দুঃসাধ্য যে, ইহাতে মৃত্যুযন্ত্রণার ন্যায় যাতনা রহিয়াছে । এতদ্‌সত্ত্বেও কামিল পীর বা সুনিপুণ অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকের নির্দেশ অনুসারে চলিলে কাজটি অনায়াসসাধ্য হইয়া যায় । কামিল পীর প্রথমেই স্বীয় মুরীদকে আল্লাহ্'র হাকীকতের দিকে আহ্বান করেন না, কারণ তখনও তাহার এই শিক্ষা গ্রহণের শক্তি অর্জিত হয় নাই । উদাহরণস্বরূপ লক্ষ্য কর, শৈশবকালে বালক-বালিকাদিগকে বিদ্যালয়ে পাঠাইবার সময় তাহাদিগকে প্রভুত্ব, প্রতিপত্তি বা রাজত্বের প্রলোভন দেখাইলে কোনই ফল হয় না; কারণ প্রভুত্ব, প্রতিপত্তি বা রাজত্ব যে কি পদার্থ তাহারা তখনও উপলব্ধি করে নাই । তাহারা যাহার আস্বাদ লাভ করিয়াছে এবং যাহা বুঝে তাহার প্রলোভন দিলেই সুফল দর্শে । বরং শিশুদিগকে যদি বল, “বাপু, বিদ্যালয়ে গমন কর, পড়া শেষ হইলে শিক্ষক মহাশয় তোমাকে ডাণ্ডা-গুলী খেলিতে দিবেন এবং আমিও তোমাকে একটি শুক পাখি ক্রয় করিয়া দিব,” তাহা হইলে এই প্রলোভনে শিশু অবশ্যই বিদ্যাভ্যাসের জন্য পাঠশালায় গমন করিবে ।
শিশু আর একটু বয়স্ক হইলে তাহাদিগকে নানারূপ সুন্দর ও বিচিত্র বসন-ভূষণের প্রলোভন দেখাইলে উপকার হয় এবং তাহারা খেলতামাশা পরিত্যাগ করিয়া বিদ্যাভ্যাসে মনোযোগী হয় । বালকের বয়স আরও বৃদ্ধি পাইলে যদি প্রভুত্ব ও প্রতিপত্তির আশ্বাস দিয়া বল “বাবা, সুন্দর বিচিত্র বসন-ভূষণে সুসজ্জিত হওয়া ত রমণীদের কাজ । কঠোর পরিশ্রম ও যত্নের সহিত বিদ্যা শিক্ষা কর, তাহা হইলে লোকে তোমাকে সম্মান ও শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিবে, তোমাকে প্রভুত্ব দান করিবে এবং তুমি একজন বড়লোক হইয়া যাইবে, ”তবে উপকার পাইবে ।
তাহার বয়স আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে বলিবে- “বাবা, এ জগতে প্রভুত্ব, প্রতিপত্তি বা বড়মানুষির কোনই মূল্য নাই । মৃত্যুর সাথে সাথে সমস্তই নিঃশেষ হইয়া যাইবে । সুতরাং পরকালের চিরস্থায়ী বাদশাহী লাভের জন্য বিদ্যা শিক্ষা কর ।” এইরূপে প্রলোভন দিতে থাকিলে শৈশবকাল হইতেই অতিশয় আনন্দ ও আগ্রহের সহিত মানব বিদ্যাভ্যাস করিতে প্রবৃত্ত হয় । ধর্মপথের পথিকদিগকেও রিয়াযতকালে এই নিয়মানুসারে পরিচালনা করা আবশ্যক ।
পীর যদি প্রাথমিক অবস্থায়ই মুরীদকে এক লাফে চরম ও পরম লক্ষ্যবস্তু আল্লাহকে ধরিবার নির্দেশ দান করেন তবে ইহা তাহার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হইয়া পড়ে । প্রথম হইতেই একমাত্র আল্লাহ্'র জন্য ইখলাস বা পূর্ণ বিশুদ্ধ সঙ্কল্পে কাজ করিয়া যাওয়া নিতান্ত দুরূহ ও দুঃসাধ্য বিষয় । তাই কামিল পীর স্বীয় মুরীদকে ধর্মপথে চলিবার অনুমতি প্রদান করিয়া বলেন, “হে শিষ্যবৃন্দ, তোমরা সৎস্বভাব অর্জনের জন্য কঠোর সাধনা ও পরিশ্রম করিতে থাক, তোমরা সৎ হইলে লোকে তোমাদের প্রশংসা করিবে ।”
এইরূপে প্রশংসা লাভের দিকে আকৃষ্ট করিয়া মুরীদদের অন্তর হইতে অতিরিক্ত পানাহারের লিপ্সা ও ধনাসক্তি দমন করিতে হইবে । ইহাতে পানাহারের লোভ ও ধনাসক্তি দমন হইবে বটে, কিন্তু তৎপরিবর্তে গর্ব ও যশ-প্রতিপত্তির লালসা তাহাদের অন্তরে জন্মলাভ করিবে । কিন্তু পীর যখন দেখিবেন যে, মুরীদের অন্তর হইতে লিপ্সা ও ধনাসক্তি বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে তখন তিনি তাহার যশ-প্রতিপত্তির লালসা ও প্রশংসা পাইবার লোভকে দমন করিতে চেষ্টা করিবেন । তজ্জন্য বাজারে ও প্রকাশ্য পথে ভিক্ষুকের বেশে বিচরণ করিবার নিমিত্ত মুরীদকে নির্দেশ দিতে হইবে । ইহাতে অন্তর হইতে যশোলিপ্সা, সম্মান লালসা, মান-অভিমান চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যাইবে । তখন ভিক্ষুকবেশ পরিবর্তন করিয়া তাহাকে মেথররূপে পায়খানা পরিষ্কার ইত্যাদি নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য কাজে নিয়োগ করিতে হইবে । এইরূপে ঘৃণ্য প্রবৃত্তিও তাহার হৃদয় হইতে চূর্ণ হইয়া যাইবে ৷ এই নিয়মে পীর মুরীদের অন্তরে যখন যে প্রবৃত্তি প্রবল দেখিবে তখনই মাত্রা পরিমাণ ইহার ঔষধ প্রয়োগ করিবেন । একবারে সমস্ত কুপ্রবৃত্তি দমনের আদেশ দিলে ইহা মুরীদের পক্ষে দুষ্কর হইয়া উঠিবে ।

পরবর্তী পর্ব

Comments

Popular posts from this blog

চরিত্র সংশোধন (১৩) আন্তরিক ব্যাধির ঔষধ ও প্রয়োগ বিধি

চরিত্র সংশোধন (১০) কুম্বভাবের প্রতিষেধক

চরিত্র সংশোধন (৮) ক্রোধ ও লোভকে আজ্ঞাবহ রাখার প্রতিবন্ধক