ইলম – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

  


ইলম

(📚 মিনহাজুল আবেদীন )

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের তৌফিক ও সাহায্যে শুরু করছি। ওহে, আল্লাহ্’র ইখলাস ও ইবাদতের প্রার্থী, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে নেক তৌফিক দান করুন! মনে রেখো, প্রথমেই ইলম অপরিহার্য ও জরুরী কেননা এটাই সব কিছুর ভিত্তিমূল। আর ইল্‌ম ও ইবাদতে ইলাহী — এ দু'টি এমন মূল্যবান বস্তু, যার - জন্য এ সৃষ্টি-জগতের সকল ব্যবস্থাপনা। আমরা যা চোখে দেখছি ও কানে শুনছি, তার সবকিছু এজন্যই। গ্রন্থ রচনাকারীদের গ্রন্থ থেকে হোক, শিক্ষকের শিক্ষা থেকে হোক কিংবা বক্তার বক্তৃতা বা পরীক্ষকের পরীক্ষা থেকেই হোক, যেভাবেই আমরা যা কিছু জানছি, শুনছি – সবকিছু এ উদ্দেশ্যেই। বরং এ - কারণেই করা হয়েছে আসমান-যমীন তথা সমস্ত মখলুকাত পয়দা।

পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত দু'টি আয়াত গভীরভাবে অনুধাবন করুন! আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন :

“আল্লাহ্ তিনিই, যিনি সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং অনুরূপভাবে যমীনও। এসবের মধ্যে আল্লাহর আহকাম নাযিল হয়, যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ্ সবকিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা সকল বস্তুকেই তাঁর ইলমের দ্বারা ঘিরে রেখেছেন”।

(সূরা তালাক : ১২)

এ আয়াতটি ইলমের ফযীলত সম্পর্কে একটি যথার্থ প্রমাণ। এরপর আর কোন প্রমাণের প্রয়োজন করে না বিশেষ করে ইলমে তওহীদ সম্পর্কে। 

অপর এক স্থানে আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন :

“আমি জিন ও মানুষকে এ জন্যই পয়দা করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে”। (সূরা যারিয়াত : ৫৬)

এ আয়াতটি ইবাদতে ইলাহীতে মশগুল হওয়া এবং তাতে দৃঢ়বদ্ধ থাকার তাগিদের সুস্পষ্ট প্রমাণ। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহেই বলা চলে যে, ইলম ও ইবাদতে ইলাহী এমন দু'টি জিনিস -- যে জন্য এ দুনিয়া ও আখিরাতের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বান্দার উপর এটা ওয়াজিব এবং জরুরী যে, কিছুতেই ইলম ও ইবাদতে ইলাহী ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে মশুগুল হবে না। তার সকল প্রচেষ্টা ও শ্রম এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে এবং এ দু'টি বিষয়ের চিন্তা-ভাবনাই তার ব্রত হবে। এ দু'টি ছাড়া অবশিষ্ট সকল বিষয় বাজে ও মূল্যহীন; এগুলোতে কোন লাভালাভ নেই। আরও মনে রাখতে হবে, উপরিউক্ত দু'টি বিষয়ের মধ্যে আবার ইলমেরই বিশেষ মর্যাদা ও স্থান রয়েছে। এ জন্যই নবী আকরাম (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন :

“সাধারণ একজন উম্মতের চাইতে আমার মর্যাদা যতখানি ঊর্ধ্বে একজন ইবাদত-গোযারের চাইতে একজন আলিমের মর্যাদাও ততখানি ঊর্ধ্বে”। তিনি অন্যত্র বলেছেন :

“আলিমের প্রতি একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা আমার নিকট রোযা ও কিয়ামসহ এক বছরের ইবাদতের চাইতেও উত্তম”।

হুযূর (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন :

আমি তোমাদের নিকট জান্নাতের সর্বাপেক্ষা মর্যাদাসম্পন্ন দলের কথা(তাদের পরিচয়) বলব? সাহাবীগণ আরয করলেন : নিশ্চয়ই ইয়া রসূল্লাহ্! অতঃপর তিনি বললেন : আমার উম্মতের আলিমগণ।

সুতরাং একথা সুস্পষ্টভাবে জানা গেল যে, ইল্‌ম ও ইবাদত – এ দু'টির - মধ্যে ইলমের মর্যাদাই অধিক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ইবাদতের জন্যই ইলমের প্রয়োজনীয়তা, নতুবা শুধু ইল্‌ম একটা বিরাট বোঝা ব্যতীত আর কিছুই নয়। অতএব দেখা যাচ্ছে, ইল্‌ম বৃক্ষ আর ইবাদতে ইলাহী তার ফল। স্বভাবতই বৃক্ষের মর্যাদা সমধিক। কেননা বৃক্ষই ভিত্তি। তবুও উপকৃত হওয়া যায় কেবল তার ফলের দ্বারাই। এ পরিপ্রেক্ষিতে উভয় বিষয়ের মধ্যে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য বিধান করা বান্দার জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।

এ বিষয়েই আলোকপাত করতে গিয়ে হাসান বসরী (রহঃ) বলেছিলেন : এমনভাবে ইলম হাসিল কর, যাতে তা ইবাদতে ইলাহীর পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে না দাড়ায় এবং ইবাদতে ইলাহীও এমন পদ্ধতিতে করো, যাতে তা ইলম হাসিলের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে। এখন একথা যখন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, বান্দার জন্য ইল্‌ম ও ইবাদতে ইলাহী — এ দু'টোরই প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, - তখন নিশ্চিতই ইলমের স্থান আগে হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা ইল্‌মই উৎস ও বুনিয়াদ।

নবী আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) উনার নিম্নোক্ত ফরমানের দ্বারা বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায় :

“ইল্‌ম হলো আমলের ইমামস্বরূপ আর আমল হচ্ছে ইলমের অনুসরণকারী”। অতএব

ইলমের অগ্রাধিকারের দু'টি কারণ।

দু'টি উপায়ে ইলমকে ইবাদতে ইলাহীর উপরে স্থান দেয়া ওয়াজিব এবং জরুরী। প্রথমত, এর দ্বারাই ইবাদতের পথ নির্দিষ্ট করতে হয়। দ্বিতীয়ত, এর  দ্বাবারাই প্রতিবন্ধকতা ও বাধা সৃষ্টিকারী বস্তুসমূহ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হয়। কেননা প্রথমে প্রকৃত মাবূদকে জানতে হবে, তারপর তাঁর ইবাদত ওয়াজিব ও জরুরী। যদি আল্লাহকে তাঁর আসমায়ে হুসনা, নির্দিষ্ট গুণাবলী এবং তাঁর প্রতি হক ও ওয়াজিবসমূহসহ জানতে না পারা যায়, তাহলে তাঁর ইবাদত কি করে সম্ভব?

কেননা অনেক সময় ইলমের অভাবে আল্লাহ্ তা'আলা ও তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে এমন ভ্রান্তিপূর্ণ আকীদার সৃষ্টি হয়, যার ফলে সমস্ত ইবাদত ধ্বংস ও বিলীন হয়ে যায় (আল্লাহ্ এমন যেন না করেন)। এ সকল ভয়াবহ বিপজ্জনক বিষয় সম্পর্কে 'ইহয়াহ্ উল উলমুদ্দীন' গ্রন্থের 'বাবুল খওফ'-এ বিশদভাবে আলোচনা করেছি।

যা হোক, অতঃপর তোমার জন্য আরও একটি বিষয় ওয়াজিব ও জরুরী মনে করবে। তা হলো, তোমার উপর যেসব বিষয় শরীয়ত অনুযায়ী ওয়াজিব, সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ইলম হাসিল করবে এবং যেসব বিষয় আদায় করার হুকুম আছে তা যথাযথ পালন করবে। তাছাড়া যেসব বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে, তা থেকে বিরত থাকবে।

এসব বিষয় ছাড়া ইবাদতে ইলাহীতে স্থির থাকা কিছুতেই সম্ভব নয়। কেননা তোমার জানাই নেই, তুমি কি করবে, কি সে জিনিস, কিভাবে তা আদায় করতে হয় আর কিভাবে পালন করা ওয়াজিব ও জরুরী।

তাছাড়া, কিসে গুনাহ হয়, কিভাবে তোমার কাজ গুনাহে পরিণত হয়— এসব জানা না থাকলে কি করে তুমি তা থেকে নিজেকে রক্ষা করবে? সুতরাং শরীয়ত অনুযায়ী ইবাদত, পবিত্রতা, নামায, রোযা – এ সবের আহকামসমূহ, শর্তাদি শিক্ষা করা প্রাথমিক কর্তব্য - ওয়াজিব। এসব ব্যাপার পূর্ণাঙ্গভাবে - আদায় করার জন্য এটা অপরিহার্য নতুবা অনেক সময় এমনও হয় যে, বছরের পর বছর ধরে, যুগের পর যুগ ধরে একজন ইবাদত করে আসছে, কিন্তু তা এতটুকুও কবূলের যোগ্য হয়নি। কেননা তার ইবাদত ও পবিত্রতা হাসিলের পদ্ধতির কোনটিই সুন্নতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারেনি। অথচ তার ইবাদত যে এমনভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, একথাও সে জানতে পারছে না। আবার কখনো উপরিউক্ত বিষয়সমূহ পালন করতে গিয়ে মুশকিল দেখা দিতে পারে, অথচ তা দূর করার পদ্ধতিও তোমার জানা নেই। এর ফলে সারা ব্যাপারটাই এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, তুমি আদৌ কিছু হাসিল করতে পারছ না। তদুপরি উপরিউক্ত ইবাদত ও আহকামসমূহের সাথে বাতেনী ইবাদতের সম্পর্ক সুগভীর। এ জন্য সকল বিষয়ে শিক্ষালাভ ও তা হাসিল করাও জরুরী। বাতেনী ইবাদতের ফলে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় কতকগুলো উত্তম বৈশিষ্ট্য। যথা- - তাওয়াক্কুল(নির্ভরশীলতা), তাফবীজ (সমর্পণ), রেযা (সন্তুষ্টি), সবর (ধৈর্য), তওবা এবং ইখলাস প্রভৃতি। পরবর্তীতে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর বিপরীত দিকগুলো হলো – অতি লোভ, রিয়া ও হলো- অহংকার। এগুলোর স্বরূপ জানা ও তা থেকে বিরত থাকাও তোমার জন্য জরুরী। কেননা এর সবই ফরয। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর পবিত্র কালামে ও তাঁর প্রেরিত নবী হযরত রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মুখে যেসব বিষয় করতে বলেছেন এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, তার সবই অবশ্য পালনীয় । আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেনঃ

“যদি তুমি পূর্ণ ঈমানদার হও, আল্লাহর উপরই ভরসা করো।

(সূরা মায়িদাঃ ২৩)

আল্লাহ্ তা'আলার শোকর করো, যদি তুমি তাঁরই ইবাদত কর।

(সূরা বাকারা : ১৭২)

এবং সবর করো, আর (মনে রেখো) আল্লাহ্ তা'আলার সাহায্য ব্যতীত তুমি সবর করতে সক্ষম হবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে ইখলাসের সম্পর্ক গড়ে তোল । (সূরা নাহল : ১২৭ )

এছাড়াও কালামে পাকে এ ধরনের বহু আয়াত রয়েছে। যেমন নামায, রোযা প্রভৃতি আদায় করার প্রেরণা দানকারী বহু আয়াত আছে। কিন্তু তুমি করছ কি, নামায ও রোযার প্রতি তো মনোযোগ দান করছই, কিন্তু ঐসব ফরয বিষয় সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে বসেছ । অথচ একই আল্লাহ্ তাঁর একই কিতাবে উভয় বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। বরং তুমি ওসব থেকে তো সম্পূর্ণ উদাসীনই হয়ে পড়েছ। এর কোন একটা বিষয়ও সে ব্যক্তির ন্যায় জানতে পারোনি, যার সকাল হয় তার প্রাপ্য অংশ নিয়েই। এমনকি, তুমি তো হালালকে হারাম আর হারামকেই হালাল বানিয়ে নিয়েছ। আর যে ব্যক্তি এমনভাবে আল্লাহ্ তা'আলার কিতাবে বর্ণিত উজ্জ্বল হিকমত ও হিদায়েতরূপী ইলমকে ত্যাগ করেছে এবং হারাম কাজকে গ্রহণ করেছে, সে নিশ্চয়ই নিজেকে দোযখের ইন্ধন হিসেবে প্রস্তুত করছে। ওহে ইবাদতের তলবগার! তোমার কি এ জন্য ভয় হচ্ছে না যে, তুমি ওয়াজিবসমূহকে উপেক্ষা করে চলেছো? বরং ওয়াজিবসমূহের অধিকাংশ বাদ দিয়ে নফল নামায ও রোযায় মশগুল হয়ে পড়েছ যার ফলে তোমার এ শেষোক্ত ইবাদতও তো অস্তিত্বহীনের পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হবে। আর অধিকাংশ লোকই তো এ পাপের যে কোন একটাতে লিপ্ত হতে থাকে। এর ফলে দোযখ ওয়াজিব হয়ে যায়। অধিকন্তু খাওয়া-দাওয়া, শোয়া-বসার ক্ষেত্রেও সেসব উত্তম বিষয়কে ত্যাগ করে, যার দ্বারা' আল্লাহ্'র নৈকট্য লাভ হয়। এমন অবস্থায় পৌঁছার পর তোমার মধ্যে কোন কাজের যোগ্যতা আর অবশিষ্ট থাকে না। -

এ সবের চাইতেও গুরুতর ব্যাপার এই যে, আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ বৃদ্ধিই পায়, আর মানুষ আশার কুহকিনী মায়ায় বিমুগ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ আকাঙ্ক্ষা বস্তুটিই একটি পাপ। কিন্তু এতে পার্থক্য ধরতে না পারার এবং এর সাথে কতিপয় বিষয় জড়িত থাকার ফলে এটিকে মানুষ উত্তম ধারণার মধ্যে গণ্য করে। এমনিভাবে নানা অবস্থায় নিপতিত থেকেও মনে করে যে, বুঝি আল্লাহ্র সান্নিধ্যের আনন্দ লাভ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রিয়া ও দেখানো বিষয়কেই আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা আদায় মনে করতে থাকে অথবা মনে করে, এর দ্বারা মানুষকে উত্তম এবং নেক পথে আহবান করা হচ্ছে। ফলে আল্লাহ্র নিকট পাপকে নেকী মনে করে পেশ করা হয়। অধিকন্তু নিন্দা ও শাস্তির মকামে সওয়াবের আশায় প্রহর গোণে । এ সময় সে মস্তবড় ধোঁকা, মারাত্মক ভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়। আল্লাহর কসম, ইল্‌ম ব্যতীত যাবা আল্লাহ্র ইবাদতে লিপ্ত তাদের জন্য সত্যিই এটা মারাত্মক বিপদের স্থান – হতাশা এবং আফসোসের মকাম। -

এর পরেও আছে সমস্ত জাহের ইবাদতের জন্য বাতেনী বিষয় সংশ্লিষ্ট। যেমন— ইখলাস এবং রিয়া, অহংকার ও বিনয় প্রভৃতি।

সুতরাং যে ব্যক্তি জাহেরী ইবাদতের সময় সকল বাতেনী দ্বন্দ্বের বিষয়কে উপেক্ষা করে চলবে এবং সেসব পরিহার করা এবং তা থেকে নিজের আমলকে নিরাপদ রাখার বিষয় চিন্তা না করেই এগিয়ে যাবে, তিনি তাঁর জাহেরী আমলকেও নিরাপদে রাখতে খুব বেশী সক্ষম হবেন না। বরং এমতাবস্থায় জাহেরী এবং বাতেনী – উভয় প্রকার ইবাদতই ধ্বংস হয়ে যায়। তখন তার হাতে বঞ্চনা ও অসন্তোষ ব্যতীত আর কিছুই বাকি থাকে না। এ ধরনের ক্ষতি মারাত্মক। এ জন্যই নবী আকরাম ( সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেছেন :

“ইলম হাসিলের পর নিদ্রা যাওয়া মূর্খতা নিয়ে নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম”। কেননা ইল্‌ম ব্যতীত আমলকারী অধিক বিশৃংখলার সৃষ্টি করে। তাছাড়া, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম) ইল্‌ম সম্পর্কে আরও বলেছেন : “এ জিনিসটি নেক-বখতকে দান করা হয় এবং বদ-বখতকে এ থেকে করা হয় বঞ্চিত”। অর্থাৎ অবাধ্যতার প্রথম জিনিসটি হলো ইলম হাসিল না করা। সুতরাং এরপর যদি কেউ বিনা ইলমেই ইবাদতের চেষ্টায় লিপ্ত হয়, তবে তার চাইতে অবাধ্যতা আর কি হতে পারে?

যে ইলম ও আমলের দ্বারা কোন উপকার হয় না, তা থেকে দূরে থাকার জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নিকট দোয়া করা উচিত। এ জন্যই সমগ্র মানবজাতির প্রতি উলামায়ে কিরাম, সাধক ও ইবাদত গোযারগণের অনুগ্রহ ও মেহেরবানী রয়েছে-- বিশেষ করে ইলমের প্রতি প্রেরণা দানের ব্যাপারে; কেননা ইবাদতের ভিত্তি, তার পূর্ণতা ও আল্লাহ্ তা'আলার খেদমত সবকিছুই ইলমের উপর নির্ভরশীল। দৃষ্টিসম্পন্ন ও তৌফিকমন্দ ব্যক্তিদের ধ্যান-ধারণার ক্ষেত্রও এটাই ।

সুতরাং একথা যখন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, ইবাদতে ইলাহী বান্দার করা উচিত এবং ইলম ছাড়া তা সঠিক ও নিরাপদভাবে করা সম্ভব নয়, তখন ইলমকে ইবাদতের অগ্রে স্থান দান করা ওয়াজিব এবং জরুরী।

ইলমকে ইবাদতের আগে স্থান দেয়ার দ্বিতীয় কারণটি হলো এই যে, ফলপ্রসূ ইলম মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ ভীতি জাগ্রত করে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন :

“বস্তুত আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলিমগণই তাঁকে ভয় করেন”।

কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলাকে তাঁর মারেফত অনুযায়ী স্বরূপ চিনতে পারবে না, সে কিছুতেই আল্লাহ্র হায়বত ও জালাল মুতাবিক ভয় এবং মহত্ত ও উদারতা অনুযায়ী সম্মান করতে পারবে না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইলমের দ্বারাই আল্লাহর মারেফত, আজমত এবং তাঁর প্রতি ভয় সৃষ্টি হতে পারে। ইল্মই সকল নেকীর প্রতি উৎসাহ প্রদর্শন করে এবং সকল পাপে আল্লাহ্ প্রদত্ত তৌফিকের দ্বারা বাধা প্রদান করে।

মোটকথা, আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতের দ্বারা বান্দার এ ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যও নেই । সুতরাং ওহে আল্লাহর পথের অভিযাত্রী! আল্লাহ্ তা'আলা প্রত্যেক বিষয়ের শুরুতেই তোমাকে হিদায়েত করুন। (মনে রেখো) ইলম হাসিল করা অবশ্য কর্তব্য – আর আল্লাহ্ তা'আলাই তাঁর রহমত ও করুণার দ্বার উন্মুক্ত করে ইলম হাসিলের তৌফিক দান করতে পারেন।


 পরবর্তী পর্ব– ইলমের প্রয়োজনীয়তা


Comments

Popular posts from this blog

চরিত্র সংশোধন (১৩) আন্তরিক ব্যাধির ঔষধ ও প্রয়োগ বিধি

চরিত্র সংশোধন (১০) কুম্বভাবের প্রতিষেধক

চরিত্র সংশোধন (৮) ক্রোধ ও লোভকে আজ্ঞাবহ রাখার প্রতিবন্ধক